মো. মাহবুবুর রহমান: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে এসেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
২০২৪ সালে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় এইচএসসি বা সমমান। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, সেই যোগ্যতা আরও বাড়িয়ে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে শিক্ষিত, দক্ষ ও সচেতন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দিক থেকে এটি ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
কিন্তু সম্প্রতি সেই যোগ্যতা শিথিল করার আলোচনা শুরু হওয়ায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি শিক্ষানীতির অংশ, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা?
যোগ্যতা নির্ধারণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মে ২০২৪:
নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধানমালা সংশোধন করে সভাপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম এইচএসসি বা সমমান বাধ্যতামূলক করা হয়।
আগস্ট ২০২৫:
পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে সেই যোগ্যতা আরও বাড়িয়ে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি আবশ্যিক করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন এবং নেতৃত্বে দক্ষ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দিক থেকে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন।
২০২৬ (বর্তমান প্রস্তাব):
চলতি বছরে সেই স্নাতক যোগ্যতা শিথিল করে আবারও এইচএসসি কিংবা তারও নিচে নামিয়ে আনার আলোচনা চলছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব পুনরায় শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কেন এই পদক্ষেপ উদ্বেগজনক?
১. শিক্ষার মানের প্রশ্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়; তিনি প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যদি সেই ব্যক্তির প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত ভিত্তি না থাকে, তবে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিক কতটা কার্যকরভাবে তিনি অনুধাবন করতে পারবেন—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
একবার শিক্ষাগত যোগ্যতার মান উন্নীত করার পর তা আবার কমিয়ে আনা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
২. রাজনীতিকরণের আশঙ্কা
সরকারি দপ্তর, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে—উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এর ফলে শিক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবই অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের সিদ্ধান্ত সেই প্রবণতায় কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ এনেছিল। এখন সেই মানদণ্ড শিথিল করা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব পুনরায় জোরদার হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
৩. নীতিনির্ধারণে অসংগতি
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার নিয়ম পরিবর্তন কোনো নীতির স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয় না। এক বছরে দুবার মানদণ্ড পরিবর্তনের পর আবার সেটি শিথিল করার আলোচনা নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্থিতিশীল নীতি থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের সঙ্গে সাদৃশ্য
সম্প্রতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়েও সমাজে আলোচনা হয়েছে—সেখানে যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনা কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যদি প্রশাসন ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পেতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ও বাস্তবতা
শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, রাজনীতিকরণ কমানো এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার আলোচনা অনেকের কাছেই কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে মনে হতে পারে।
এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞানচর্চার জায়গা নয়; এটি একটি সমাজের মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্র।
যদি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও নৈতিক মানদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যেও প্রতিফলিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষ শিক্ষকরা অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহ হারাতে পারেন।
প্রত্যাশা ও প্রস্তাবনা
১. সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানোর পরিবর্তে তা বজায় রাখা বা প্রয়োজনে আরও উন্নত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে একটি পেশাগত ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে শিক্ষাব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।
৪. এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যোগ্য, সচেতন ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে ধরে রাখা এবং প্রয়োজন হলে তা আরও উন্নত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাভিত্তিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের লক্ষ্য বাস্তব রূপ পেতে পারে।
অনলাইন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার অপেক্ষায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকসমাজসহ সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা—দেশের শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় সরকার পূর্বে নেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না।
অনেকের ধারণা, যদি পূর্বের মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে যাওয়া হয়, তবে তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রত্যাশা—দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ বিবেচনায় একটি সুদূরপ্রসারী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ফরিদপুর সিটি কলেজ,ফরিদপুর।
ইমেইল : mmrrajbari71@gmail.com
