বিশেষ প্রতিবেদক:
হাম হচ্ছে খুবই সংক্রামক ভাইরাসজনিত এক রোগ। যারা টিকার সবকটি ডোজ সম্পন্ন করেননি তাদের মধ্যে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে রোগটি।
টিকা দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানোর পরও সঠিক সময়ে সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু সংক্রামক রোগ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে এ সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, গেল মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া ‘হাম মুক্ত দেশ’-এর মর্যাদা হারানো ছয়টি দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য একটি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং শিশুদের সুরক্ষায় সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদানের হার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
হাম আসলে কী?
হাম হচ্ছে খুবই সংক্রামক ভাইরাসজনিত এক রোগ। যারা টিকার সবকটি ডোজ সম্পন্ন করেননি তাদের মধ্যে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। সাধারণত সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দিয়ে শুরু হয় এবং কয়েক দিন পর শরীরে র্যাশ বা লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
র্যাশ প্রথমে মুখে ও কানের পেছনে দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। হামের বিভিন্ন ফুসকুড়িতে সাধারণত চুলকানি হয় না। তবে এগুলো কিছুটা ফুলে উঠতে পারে এবং অনেক ফুসকুড়ি মিলে বড় লালচে ছোপ তৈরি করে। অনেকের ক্ষেত্রে মুখের ভেতরেও ছোট ছোট সাদাটে দাগ দেখা দিতে পারে।
যেভাবে ছড়ায়
হাম সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, কাশি বা হাঁচিতে এ ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের সংক্রমণের হার কতটা শক্তিশালী তা এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, যেখানে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারেন।
টিকা না নেওয়া কোনো ব্যক্তি যদি আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে আসেন তবে ১০ জনের মধ্যে ৯ জনেরই এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম দিন বা র্যাশ ওঠার প্রায় ৪ দিন আগে থেকে শুরু করে দেহে র্যাশ বের হওয়ার পরবর্তী ৪ দিন পর্যন্ত একজন রোগী অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, হাম ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে ঘরের জানালা-দরজা খোলা রাখা উচিত, যাতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে।
এ ছাড়া নিয়মিত সাবান ও হালকা গরম পানি দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার এবং ব্যবহারের পরপরই তা দ্রুত ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া জরুরি।
হামের কারণে কী কী ঝুঁকি হতে পারে?
অনেক মানুষ এই রোগ থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও অনেকের ক্ষেত্রে তা মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। হাম থেকে নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা এবং বিরল ক্ষেত্রে স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা বা মৃত্যুও হতে পারে।
সবাই আক্রান্ত হতে পারলেও বেশি ঝুঁকিতে আছেন, নবজাতক ও ছোট শিশুরা, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং সেইসঙ্গে গর্ভবতী নারীরা।
হামের সংক্রমণ বাড়ার কারণ কী?
হাম টিকা দেওয়ার মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সংক্রামক হওয়ায় যখনই কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে যায় তখনই রোগটি ফিরে আসে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে মানুষের মধ্যে টিকার প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্য তার ‘হাম মুক্ত’ দেশের মর্যাদা হারিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, কোনো দেশে টানা ১২ মাস নিজস্ব কোনো সংক্রমণ না থাকলে এ মর্যাদা পায়। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি স্পেন, অস্ট্রিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানও এ মর্যাদা হারিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। ফ্রান্স ও রোমানিয়াসহ বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশে নিয়মিতভাবে হাম ছড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে কানাডা ‘হাম নির্মূল’ দেশের মর্যাদা হারিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও বর্তমানে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে নিজেদের মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
সন্তানকে যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন
হামের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে টিকার দুটি ডোজ গ্রহণ করলে উচ্চমাত্রায় সুরক্ষা মেলে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সাহায্য করে।
এমএমআর ও এমএমআরভি উভয় টিকাই হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে এমএমআরভি টিকা বাড়তি হিসেবে জলবসন্ত থেকেও সুরক্ষা দেয়। সাধারণত শিশুদের ১২ মাস ও ১৮ মাস বয়সে এসব টিকা দিতে হয়।
যেসব লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন?
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পর বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় লক্ষণ দেহে স্পষ্ট র্যাশ বা লালচে ফুসকুড়ি।
প্রাথমিক লক্ষণ ৪ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়, যেখানে নাক দিয়ে পানি পড়া ও কাশি, চোখ লাল হওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং গালের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা দেওয়া।
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৮ দিনের মধ্যে র্যাশ দেখা দেয়। সাধারণত প্রথমে মুখে ও ঘাড়ের উপরের অংশে শুরু হয় র্যাশ। পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে তা হাত ও পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। র্যাশটি মিলিয়ে যাওয়ার আগে প্রায় এক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।- বিডি নিউজ
