এ এইচ এম মাহবুবুল হাসান পিংকু: একটি পুরনো প্রবাদ আছে—সকালের সূর্যই বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে। সংসদের সূচনালগ্নে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা সেই কথাটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। শুরুতেই জাতীয় সংসদের মাইক্রোফোন বিভ্রাট—দেখার যেন কেউ নেই। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অধিবেশনের শুরুতেই এই অব্যবস্থাপনা শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, এটি অনেকের কাছে প্রস্তুতির অভাব ও রাজনৈতিক অমনোযোগের প্রতীক হিসেবেই ধরা দিয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক সংগ্রাম, দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে এসে যে দল আজ ২১৩ জন সংসদ সদস্য নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা ছিল অনেক বড়। কিন্তু সংসদের প্রথম দিনেই যে চিত্র দেখা গেল, তাতে প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল রাজনৈতিক শক্তির ভেতরে কি সত্যিই সেই মেধা, দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা আছে, যা একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজন?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটি তৈরি হয়েছে সংসদের শোক প্রস্তাবকে ঘিরে। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণ করতে গিয়ে আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সেখানে বাদ পড়েছে শহীদ ওয়াসিমের নাম—যিনি ছিলেন সেই আন্দোলনে বিএনপির প্রথম শহীদ কর্মী। একটি আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম শহীদের নাম ভুলে যাওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি রাজনৈতিক স্মৃতিহীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
অবশ্য স্পিকার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে শহীদ ওয়াসিমের নাম উল্লেখ করেছেন, যা ছিল তাঁর নিজস্ব প্রস্তুত করা বক্তব্যের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—শোক প্রস্তাবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে কেন এই নামটি অনুপস্থিত থাকবে?
রাজনীতিতে উদারতা অবশ্যই একটি মূল্যবোধ। প্রতিপক্ষের প্রতিও সহনশীলতা দেখানো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই উদারতা যদি নিজের ইতিহাস, নিজের কর্মীর আত্মত্যাগ এবং নিজের আন্দোলনের স্মৃতিকে বিস্মৃত করে প্রদর্শিত হয়, তাহলে তা আর মহত্ত্ব থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দুর্বলতা।
ঘটনাটিকে আরও বিব্রতকর করে তুলেছে পরবর্তী দৃশ্য। দেখা গেল, জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদে দাঁড়িয়ে শহীদ ওয়াসিমের নামটি বিএনপিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। নিজের দলের প্রথম শহীদের নাম প্রতিপক্ষের মুখে শুনতে হওয়া—এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের রাজনৈতিক লজ্জা।
এদিকে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির বক্তব্যে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রসঙ্গও শোক প্রস্তাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সবসময়ই একটি স্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে—কেউ কেউ হয়তো সেই সীমারেখাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট করে তুলতে চাইছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস রক্তে লেখা। মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ। সেই ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে কিংবা রাজনৈতিক কৌশলের নামে তাকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনীতি টেকসই হতে পারে না।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; এটি জাতির ইতিহাসের অংশ। বিশেষ করে শহীদ ওয়াসিমের মতো একজন কর্মীর আত্মত্যাগ—যিনি সেই আন্দোলনে বিএনপির প্রথম শহীদ—তার নাম উপেক্ষিত হওয়া শুধু একটি ভুল নয়, এটি দায়িত্বহীনতার পরিচয়।
রাজনীতিতে মেধা, স্মৃতি ও নৈতিক সাহস—এই তিনটির কোনো বিকল্প নেই। যখন রাজনীতি এসব হারাতে শুরু করে, তখন তা কেবল ক্ষমতার খেলা হয়ে দাঁড়ায়। আর মেধাহীন ক্ষমতার রাজনীতি কখনোই জাতির জন্য শুভ বার্তা বহন করে না।
সংসদের প্রথম দিনের ঘটনাগুলো তাই শুধু একটি দিনের ত্রুটি নয়; এটি আমাদের রাজনীতির সামনে একটি সতর্কবার্তা। যদি আমরা ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে না পারি, তবে সেই সূর্যোদয় কখনোই উজ্জ্বল দিনের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না।
