মুজতবা হাকিম প্লেটো :
আওয়ামী লীগ কেন বামপন্থীদের প্রধান শত্রু সেটা বোঝার জন্য ষাট দশকে ফিরতে হবে।
ভারতের স্বাধীনতার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতীয় কংগ্রেসের ঘনিষ্ট ছিল। ষাট দশকে লাল-চীন রুশদের বিরুদ্ধে চলে গেলে পাকিস্তানের বামরা দুই ভাগ হয়ে যায়। সে সময়ের চীনপন্থীদের বংশধররা আজ চিংকু বাম বা লালবটর। আওয়ামী লীগ তাদের দুই চোখের বিষ। কেন?
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ শুরু থেকেই ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু চীনা বামেরা ষাট দশকে ভারতকে বুর্জোয়া রাষ্ট্র হিসেবে প্রধান শত্রু বানিয়ে দেগে দেয়। মনের মধ্যে তাগিদ যোগায় মুসলিম লীগ ও আরএসএস-এর যৌথ প্রযোজনায় গড়া হিন্দু-মুসলিম দ্বিজাতি তত্ত্ব।
সোভিয়েতের বিরুদ্ধে গিয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়া শুরু করলে সোনায় সোহাগা হয়ে ওঠে। ভাসানীর ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ বহুল প্রচলিত। বিপ্লবের স্বার্থে নিজ দেশের শাসক শ্রেণীর সঙ্গে কী দারুণ মাখামাখি। পাকিস্তানে বসে ভারতে বিপ্লব করবে আরকি।
দ্বিজাতি তত্ত্বর ঘোরাচ্ছন্নতার কারণে যে সব দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। এদের ভাগ্যও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ভূ-রাজনৈতিক চক্করে রাশিয়া ও ভারতের বন্ধুত্ব, অন্যদিকে চীন পাকিস্তানের দোস্তালি। হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার পপুলিজমের দাসত্ব করল তাও আবার মার্কস-লেনিনের নামে! এই ভুল তারা স্বীকার করে না।
অথচ ষাট দশকে কত তরতাজা নিষ্ঠাবান বিপুল কর্মী বাহিনীই না তাদের ছিল। তখনও সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকায় অনুন্নত দেশে বিপ্লবের সম্ভাবনা ছিল। অথচ তাদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায় ‘রুশ-ভারতের দালাল’। ওরা মুক্তিযুদ্ধটা বুঝতেই পারল না।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য/করদরাজ্য ইত্যাদি বুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ বাংলাদেশ যে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হবে তা ডিসেম্বরের আগেই আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়। মার্কিনীরা জানতে চাইলে ইন্দিরা গান্ধী লিখিতভাবে জানিয়ে দেন— বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। এই সত্য আড়াল করে করদরাজ্যের গুজববাজী চালিয়ে যাওয়া হয়। কিছু লোককে গুজব দিয়ে কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা যায় সবসময় যায় না।
নব্বইয়ে তাদের ‘রুশ-ভারত নিপাত যাক’ স্লোগানের তোড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেল। বিশ্ব থেকে বিদায় নিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।
টুইন টাওয়ারে হামলার দু-এক বছরের মধ্যে বর্ষীয়ান এক বামনেতার মুখে শুনলাম নতুন টার্ম— ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ। ভারত সম্প্রসারণবাদী আধিপত্যবাদী থেকে সাম্রাজ্যবাদী স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলে না।
দেড়শো কোটি মানুষের বিশাল দেশ ভারত। তাদের অর্থনীতি বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে বড়। তাই বলে এত বড় না যে মার্কিন রাষ্ট্রের মত বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক।
ধরুণ আগামীকাল আমেরিকা-ইউরোপ বলল, বাংলাদেশের গার্মেন্ট আমদানি নিষিদ্ধ অথবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বলল, বাংলাদেশি শ্রমিকের চাকরি নট। এক ঘোষণাতেই বাংলাদেশের দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তাদের হাতে এতটাই বন্ধক দেওয়া। বলুন তো, ভারতের হাতে এমন কোনো ক্ষমতা কি আছে? সোজা উত্তর— না। যার কাছে দেশ বন্ধক নাই সেই দেশ কীভাবে প্রধান শক্র হয়? হয় হয়। পাকিস্তানি হিন্দু বিরোধী চুলকানি থাকলে হয়।
সম্প্রতি ভারত কেন সাম্রাজ্যবাদী তার এক মজার ভিডিও ক্লিপ পেলাম। বলছে, ভারত হায়দ্রাবাদ কাশ্মির দখল করেছে। মানে বাংলাদেশও দখল করবে আরকি।
ব্রিটিশ আমলে সাড়ে পাঁচশোর বেশি প্রিন্সলি স্টেট ছিল। যাদের গনিমতের মালের মত এতিম করে ব্রিটিশরা বিদায় নেয়। সুযোগটা ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই নিয়েছে। প্রথমে কিছু সম্মান দেখালেও সত্তর সাল নাগাদ দুই দেশই প্রিন্সলি স্টেটগুলো গিলে ফেলে। এতে ভারত সম্প্রসারণবাদী আধিপত্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী হলে পাকিস্তান কেন নয়?পাকিস্তানি হিন্দু বিরোধী চুলকানি থাকলে হয়।
পাকিস্তানের বালুচিস্তানে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ চলছে তার গোড়ায় কিন্তু ওই প্রিন্সলি স্টেট। কোনো চিংকুকে বালুচ থেকে পাকিস্তানকে হাত গোটাতে বলতে শুনেছেন? অথবা কখনো কেউ প্রশ্ন তোলে মাত্র ২ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কীভাবে পাকিস্তানের অংশ হয়। ওটাতো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল না। ওটা অবশ্য আধিপত্য নয়! বরং বাঙালিত্ব ঠেকাতে কাজে দেয়। ৪৭ সালে মাজা ভেঙে মরা পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে এখনও বুদ্ধিবৃত্তিক ঘ্যানরঘ্যানর চলছে।
এরা বোঝেই না প্রিন্সলি স্টেট আর বাংলাদেশের তফাৎ। অথবা বুঝতে চায় না। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মূল যে বিভাজন হয়েছে সেই অংশে ভারত কিংবা পাকিস্তানকে হাত বাড়াতে দেখেছেন? না দেখার কারণ আছে। বাংলাদেশের ভূমি ভারত দখল করবে না।
এবার নিশ্চয় বোঝা গেল, ভারতের মিত্র শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগকে চিরশত্রু জ্ঞান করা তত্ত্বগতভাবেই ভুল। আর দেশ স্বাধীনে আওয়ামী লীগ মূলত বাংলার কৃষকসমাজের প্রতিনিধি ভূমিকায় ছিল। ছোট দোকানদারের দল বলে তা আড়াল করা যায় না।
অবশ্য বলতে পারেন মার্শাল প্ল্যান যেমন ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঠেকিয়েছে আওয়ামী লীগের ভূমিকা অমনই। তা বটে। বিপরীতে চিংকুর উত্তরসুরীরা তখন আইযুব তোষণে ব্যস্ত ছিল সেটা মাথায় রাখলেই বুঝতে পারবেন কেন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের অধিকারী হয়েছিল।
তবে বাংলাদেশে আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটনানোর কোনো পরিস্থিতি নাই। কল্পনায় বাতাসা খেতে খেতে পেট ফুলে যাবে বিপ্লব হবে না। ভারতকে শায়েস্তা করতে গিয়ে কীভাবে মার্কিন কোলে উঠে বসল সেটা দেখাই যাচ্ছে। ভারত বধে বিশ্বব্যাবস্থা ভেঙে পড়ে না। কান টানলে মাথা হয়ে মরতে আসে নাই। বরং পেছন থেকে …লিংপং করে দিল।
তবু মাসুদ ভালো হবে না।
