মাহবুবুল হাসান পিংকু:
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অর্থনীতি, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতার নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই গভীরতর হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চীন সফরের সময় দেশের অভ্যন্তরে আকস্মিকভাবে ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁকে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরতে হয়েছিল। ওই ঘটনার পেছনে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠলেও একই সঙ্গে এটি একটি বাস্তব শিক্ষা দিয়েছে—গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কতটা অপরিহার্য।
বর্তমান সময়েও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এমন এক সময়ে দেশের বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা, উত্তেজনা এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে। ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠীর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই অঞ্চলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে যেকোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগ বা অনুমানের পরিবর্তে তথ্য ও বাস্তবতাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগের সময় রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলের উচিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং যেকোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক থাকা। কারণ, একটি স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের স্বার্থ সবচেয়ে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারে।
ইতিহাস সবসময় একইভাবে ফিরে আসে না। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বর্তমানকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফর কিংবা কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা শুধু আলোচনার টেবিলে নির্ধারিত হয় না; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ, বিচক্ষণ কূটনীতি এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।- লেখক: সাবেক সহ সভাপতি, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটি।
