মো. মাহবুবুর রহমান :
১১ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শিক্ষা খাতকে জাতীয় অগ্রযাত্রার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন এমপিও, অবকাঠামো উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণসহ বেশ কয়েকটি যুগোপযোগী উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে।
মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৩৯%)। আগের বছর ২০২৪-২৫-এ ছিল জিডিপির প্রায় ১.৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ এ বছর বরাদ্দ প্রায় ৫৬-৬৩ শতাংশ বেড়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় বড় অগ্রগতি: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের (৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা) তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ বিভাগ এ বছর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঘোষণা হলো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) প্রদানের সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এটি আশার বার্তা। এছাড়া মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষক ঘাটতি পূরণে নতুন নিয়োগ, ৪ হাজার নতুন ভবন নির্মাণ এবং অনগ্রসর এলাকায় ৫০০টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে অধ্যয়নের সুযোগ এবং অনগ্রসর এলাকার ১ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে।
শিক্ষাক্রমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: অর্থমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষাক্রম রূপান্তরিত হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অনুধাবন, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু হবে, যাতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী অন্তত একটি কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, মান্ডারিন, আরবি ও ফ্রেঞ্চ বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক বিকাশ, ক্লাবভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম (বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাহিত্যচর্চা) উৎসাহিত হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়া: শিক্ষাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ভবিষ্যতমুখী করতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র আইডি এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, কোডিং এবং ডিজিটাল লিটারেসির প্রশিক্ষণ চালু হবে। মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিবেশ, নাগরিক দায়িত্ব ও বৈশ্বিক সংযোগ: ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরিবেশ সচেতনতায় সম্পৃক্ত হবে। ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ এবং ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা চালু হবে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও আইসিটির মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা এমন আগামীর প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়বে না, বরং সমাজ ও দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে।”
পরিশেষে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় পুনর্গঠন ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বরাদ্দ বৃদ্ধি, নতুন এমপিও, অবকাঠামো উন্নয়ন, কারিগরি ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভরতা, ব্রেইন সার্কুলেশন—সব মিলিয়ে এটি একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা।
তবে শিক্ষকদের জীবনমান, পেশাগত মর্যাদা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের কল্যাণে বিনিয়োগ না করলে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হন না। বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে তবেই এ বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল মিলবে। ঘোষিত কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন হলে এই বাজেট বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে—শিক্ষা পরিণত হবে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের প্রধান শক্তিতে।-লেখক: মো. মাহবুবুর রহমান ,সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ,ফরিদপুর সিটি কলেজ.Email: mmrrajbari71@gmail.com
