সাইদা আক্তার ইমা, ভাঙা:
দীর্ঘ নয় বছর পর আবারও প্রাণ ফিরে পেল ফরিদপুরের ভাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী কুমার নদ। বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে ঘিরে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নদীর দুই পাড়ে নামে হাজারো মানুষের ঢল। বাহারি সাজে সুসজ্জিত নৌকার দ্রুতগতির প্রতিযোগিতা আর মাঝি-বৈঠিয়ালদের ছন্দময় বৈঠার টানে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

শুক্রবার দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কুমার নদের দুই পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ নদীর তীরে অবস্থান নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন বহুল প্রতীক্ষিত নৌকা বাইচের জন্য। দুপুর ৩টার পর শুরু হয় প্রতিযোগিতা।
এবারের নৌকা বাইচে ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে বাহারি নাম ও সাজের মোট ১৮টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিটি নৌকায় ছিলেন দক্ষ মাঝি ও বৈঠিয়ালদের দল। নদীর বুক চিরে নৌকার ছুটে চলা, মাঝিদের সমন্বিত বৈঠার আঘাত এবং দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে উৎসবের রূপ নেয় কুমার নদের পাড়।

স্থানীয়রা জানান, বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে বছরের পর বছর ধরে কুমার নদে নৌকা বাইচের আয়োজন হয়ে আসছিল। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দলসহ নানা জটিলতায় প্রায় নয় বছর ধরে এই আয়োজন বন্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভাঙ্গার মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়।
নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এ সময় ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল, জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মীয়াজি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক আবজাল হোসেন খান পলাশসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ভাঙ্গা বাজার ও আশপাশের এলাকায় বসেছে প্রায় ১৫ দিনব্যাপী গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের দোকানের পাশাপাশি ছিল নানা ধরনের বিনোদনের আয়োজন। ফলে নৌকা বাইচ ও মেলাকে ঘিরে পুরো ভাঙ্গা এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাইচ দেখতে কুমার নদের পাড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হওয়ায় নিরাপত্তায় নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও ডুবুরি দল নিয়োজিত ছিল। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ভাঙ্গা পৌরসভার সামনে স্থাপন করা হয় দুটি বড় ডিজিটাল স্ক্রিন। সেখানে সরাসরি নৌকা বাইচ সম্প্রচার করা হয়।
এক দর্শনার্থী বলেন, “দীর্ঘদিন পর আবার নৌকা বাইচ হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাইচ দেখতে এসেছি। এই ঐতিহ্য যেন প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
বাইচ শেষে অংশ নেওয়া ১৮টি নৌকার প্রত্যেকটিকে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে উপহার দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, “আজকের এই উৎসব বিএনপির নয়, এই উৎসব ভাঙ্গাবাসীর, এই উৎসব ফরিদপুরবাসীর। আমরা সকলে মিলে উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করব, আমরা সবাই মিলেমিশে চলতে পারি।” তিনি বলেন, রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে বিগত সরকারের সময় এই উৎসব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষ এর থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের কোনো উৎসব বন্ধ হতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, “শতবর্ষী এই উৎসব কেন বন্ধ হয়েছিল, আপনারা তা জানেন। শহিদুল ইসলাম বাবুল আপনাদের সেই উৎসব আবার ফিরিয়ে দিয়েছেন।” তিনি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, যেকোনো উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অংশ এবং এসব উৎসব এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
দীর্ঘ নয় বছর পর কুমার নদে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, বিশ্বকর্মা পূজাকে ঘিরে ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের আয়োজন করা হবে।
