স্টাফ রিপোর্টার :
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের নেই কোন সঠিক তালিকা। ঢাকার রাজপথে মিছিলে থাকা ভাষা সৈনিকসহ জেলার সক্রিয় ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিকথা আজ ম্লানের পথে।
ফরিদপুরের ভাষার সৈনিকদের গল্প জানে না নতুন প্রজন্ম! সালাম, বরকত, রফিক জব্বারের বাইরে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিজ জেলার বীরত্বগাথা ভাষা সৈনিকদের তথ্য হারাতে বসেছে। ভাষা সৈনিক হিসাবে শহরের দু-চারটি রাস্তার নামকরণ আর ফরিদপুর মিউজিয়ামে ছবির ফ্রেমে আটকে আছে তাদের স্মৃতি চিহ্ন।
এ জেলায় ভাষা আন্দোলনে বেশ কয়েকজনের অবদানের কথা শোনা যায়। এদের মধ্যে ফরিদপুর শহরের সন্তান ডা: মোহাম্মদ জাহেদ ১৯৪৮ সালে জানুয়ারী মাসে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র। ১৯৫২-৫৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি হিসাবে বিশ^বিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন তিনি।
১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস এর ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলীর আরেক সন্তান ডা: ননী গোপাল সাহা। ২১ ফেব্রুয়ারী সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গনে আমতলায় ছাত্র-জনতার সভায় যোগ দেন তিনি এবং পরে মিছিলে সামিল হন। সেদিনের সেই মিছিলেই পুলিশের গুলিবর্ষন হয়।
এছাড়াও ৫২’র সেই ভাষা আন্দোলনে শহীদ বরকত এর মৃত্যুর স্বচক্ষের স্বাক্ষী এ্যাডভোটেক এ.কে.এম. শামসুল বারী(মিয়া মোহন)। মিছিলের উপর গুলিতে বরকত যখন পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছটফট করছিলেন, তখন তিনি নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও কাঁধে করে বরকত কে মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেবার আন্দোলন করে গেছেন জেলার এই কৃতি সন্তানরা।
ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের মধ্যে ডা: মোহম্মদ জাহেদ, অধ্যাপক আবদুল গফুর, ডা: ননী গোপাল সাহা, একেএম সামসুল বারী মিয়া মোহন, মহিউদ্দিন আহমেদ, ইমাম উদ্দিন আহম্মেদ, রওশন জামাল খান, এজহারুল হক সুর্র্য মিয়া, মহীউদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন, সামসুদ্দিন মোল্যা, মনোয়ার হোসেন, এস.এম. নুরুন্নবীদের নাম শোনা যায়।

ভাষা সৈনিক সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন এর ছেলে সাজ্জাদ হোসেন রনি বলেন, মার্তৃভাষা বাংলার দাবীতে যারা যেখানে অবদান রেখেছিল তাদের স্মরণ করতে চাই ফরিদপুরবাসী। এজন্য জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে স্থানীয় ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিফলক নির্মান, একুশের বইমেলায় একটি স্টলে ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিগাথা সেই গল্প তুলে ধরা যেতে পারে। নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাদের অবদান কে শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধারার দাবী সচেতন মহলসহ নতুন প্রজন্মের।
গণমাধ্যম কর্মী(প্রথম আলো) ও নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্না বালা বলেন, মাতৃভাষা বাংলার দাবীতে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের সাথে সাথে ফরিদপুরেও সেই সময়ে সক্রিয়ভাবে বেশ কয়েকজন নানা উপায়ে সংবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদের নেমেছিল। ইমান উদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন, সামসুদ্দিন মোল্যা তারা রাজেন্দ্র কলেজ থেকে একত্রিত হয়ে তারা জেলা স্কুলে, হাইস্কুলে গিয়ে ক্যাম্পিং করেছিল। কিন্তু দু:খের বিষয় তাদের নামে কয়েকটি স্থানে সড়কের নাম করা হলেও সেখানে তাদের নামের সাথে ভাষা সৈনিক হিসাবে স্বীকৃতি পাইনি। আবার ডা: ননী গোপাল সাহা তিনি ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র থাকা অবস্থায় ৫২র ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ঝিলটুলীতে তার বাসার সামনে রাস্তার নাম ফলকটি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। যে জাতি তার বীর সন্তান কে মনে রাখে না, সে জাতিতে বীর জন্মায় না বলেও তিনি আক্ষেপ করেন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সেসময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে জেলা স্কুল হয়ে শহরের থানা রোড ও জেল খানার সামনে থেকে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়ে দুই একজনের গ্রেফতারের ইতিহাসও শোনা যায়।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা আবরাব নাদিম ইতু বলেন, ফরিদপুরে সরকারি বা বেসরকারিভাবে ভাষা সৈনিকদের নাম ঠিকানা বা তাদের কোন স্মৃতিচিহ্ন কেউ কোনদিন তুলে ধরে নি। তাই তাদের অবদানের কথা আমাদের প্রজন্ম জানিই না। যাদের অবদানে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলি তাদের স্মরণ করতে চাই। তাদের জন্য স্মৃতি ফলক, বই মেলাতে আলাদা স্টলসহ যুগউপযোগী উদ্যোগ নেয়ার দাবী তার।
নতুন প্রজন্মের তাইয়াতুল জান্নাত বলেন, ভাষা সৈনিকদের নামে শুধু সড়কের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্কুল কলেজে পাঠ বইয়ের বাইরেও তাদের নিয়ে আলোচনা, চিত্রাংকন, কুইজ ও রচনা প্রতিযোগীতাসহ বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ এবং হোস্টেল গুলোর নাম করণ করা যেতে পারে। তাহলেই তাদের অবদান ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে।
