স্টাফ রিপোর্টার:
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় মাদক সেবনের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে এক গ্রাম পুলিশ সদস্যসহ দুই যুবকের মাথার চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনার দুটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

জানা গেছে, উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের সালেপুর গ্রামের গ্রাম পুলিশ সদস্য মো. লালন খান (২৭) এবং একই গ্রামের শেখ রিয়াজুল (২৩)-কে বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে স্থানীয় লোকজন আটক করে বাজারে নিয়ে আসে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগ তোলা হয়। পরে জনতার সামনে তাদের মাথার চুল অস্বাভাবিকভাবে কেটে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে ১ মিনিট ৫২ সেকেন্ড ও ২ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, চর হরিরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক খান এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মোকা মৃধার মাঝখানে বসে আছেন গ্রাম পুলিশ লালন খান। এ সময় তাকে মাদক গ্রহণ ও মাদক সংগ্রহের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে দেখা যায়।
অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লালন খান ও শেখ রিয়াজুলকে বসিয়ে ট্রিমার দিয়ে মাথার চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে। লালন খানের মাথায় প্লাস (+) আকৃতির চিহ্ন রেখে চুল কাটা হয় এবং রিয়াজুলের কপাল থেকে মাথার ওপরের অংশ পর্যন্ত চুল কেটে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজনকে এ সময় হাসাহাসি ও মন্তব্য করতে শোনা যায়।
এ বিষয়ে চর হরিরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক খান বলেন, “এলাকার কিছু যুবক গ্রাম পুলিশ লালন খানকে গাঁজা সেবনের অভিযোগে ধরে বাজারে নিয়ে আসে। আমি সেখানে উপস্থিত থাকায় তাকে কিছু কথা বলে সতর্ক করেছি। তবে চুল কাটার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না।”

ঘটনার বিষয়ে চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “ভিডিও দুটি আমরা দেখেছি। কারও বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণ বা সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলেই তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই। এটি আইনবহির্ভূত কাজ। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তুলে ধরা উচিত। নিজেরা বিচারক সেজে কাউকে অপমান বা শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। ভাইরাল হওয়া এ ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাড. শিপ্রা গোস্বামী বলেন, “কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে কি না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মাদক সেবন বা অন্য কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে প্রকাশ্যে অপমান, শারীরিক বা মানসিকভাবে হেনস্তা করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনা সমাজে আইনের শাসনের পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা ও বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা উচিত ছিল।
