সাইদা আক্তার ইমা:
ছোটবেলা থেকেই পরিবারে ছিল অভাব-অনটন। না খেয়ে কাটিয়েছেন অনেক রাত। দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কোনও রকমে টিকে ছিলেন অদম্য সাহসী নারী দীপালী আক্তার। জীবন বাঁচাতে পদ্মা থেকে মাছ ধরে কিংবা চরের কাশবন থেকে কাশফুল এনে বিক্রি করতেন। বাবা, দুই ভাই আর দুই বোনের সংসারের দুঃখ ঘোচাতে পাড়ি জমান বিদেশে।
সেখানে গিয়ে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনেন। দুই বোনের বিয়েও দেন, কিন্তু নিজে বিয়ে করেননি। বাড়িতে চকচকে টিনের ঘর দিয়েছেন। সেখানে বসবাস করছেন তার বাবা, ভাই-বোনেরা। সারা জীবন সংসারের অভাব, দরিদ্রতা ঘুচাতে যিনি বিদেশের মাটিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন সেই দীপালী আক্তারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দীপালীকে হারিয়ে স্তব্দ হয়ে গেছে গোটা পরিবার।
দীপালীর বোন লাইজু বেগম বলেন,
‘বইনের মুখখান শেষবারের মতো দেখবার চাই। আমাগো সরকারের কাছে দাবি জানাই আমার বইনের লাশটা দেশে আনবার ব্যবস্থা কইরা দেন’।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে তার বোন বেশ কষ্টে ছিলেন। দুইবেলা রুটি খেয়ে দিন কাটাতেন। যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান জীবন বাঁচাতে। বুধবার রাতে দীপালীর সঙ্গে শেষ কথা হয় বলে জানান লাইজু।
তিনি বলেন, তাকে ফোন করে বলা হয়, যে বাড়িতে কাজ করে সেই বাড়ির সদস্যসহ সে অন্য এলাকায় এসেছেন। আগে যেখানে ছিলেন সেখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা বেশী। কিছুদিন এখানে থাকার পর যুদ্ধ বন্ধ হলে আগের যায়গায় যাবেন। দীপালী খুব কষ্টে আছেন বলে ফোনে জানান। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি।
দীপালীর বাবা শেখ মোফাজ্জেল জানান, ‘তারে দেশে আইন্যা মাটি দিবার চাই, আপনারা আমার মাইয়াড্যারে আনবার ব্যবস্থা কইরা দ্যান’।
দুর্গম পদ্মাচরের মেয়ে দীপালী নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। দীপালীর মা রাজিয়া বেগম ৮ বছর আগে বজ্রপাতে মারা যান।
পরিবারের অভাবের কথা চিন্তা করে ১৯ বছর বয়সে ২০১১ সালে প্রথমবার লেবাননে যান গৃহকর্মী হিসেবে। দীর্ঘদিন সেখানে থাকার পর ১৮ সালে দেশে ফিরে আসেন। ফের ২০২৩ সালে লেবাননে যান। প্রথমবার বিদেশে যাবার পর দেশে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতেন। তার সেই টাকায় দু বোনের বিয়ে হয়। বাড়িতে টিনের ঘর ওঠে। দ্বিতীয়বার বিদেশে যাবার পর কয়েক মাস টাকা পাঠান দেশে। তবে কয়েক মাস আগে বেশ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন দীপালী। কাজ কর্ম তেমন একটা করতে পারতেন না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ ফালু বলেন, পরিবারটি খুব অসচ্ছল। মেয়েটি অনেক কষ্ট করে বিদেশে গিয়ে কাজ করছিল। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই দ্রুত মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ জানান, নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা সার্বিকভাবে পরিবারটির পাশে আছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা চলছে।
প্রসঙ্গত: গত বুধবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের চর হাজিগঞ্জ গ্রামের শালেপুর এলাকার বাসিন্দা শেখ মোফাজ্জলের মেয়ে দীপালী আক্তার।
