স্টাফ রিপোরটার :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর জেলার চারটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এখন ফরিদপুর-১ (আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী)।
এই জটিল রাজনৈতিক সমিকরনের অন্যতম রয়েছেন ৮১ বছর বয়সী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিক সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে হাতেখড়ি, একাত্তরের রণাঙ্গনে ফিল্ড কমান্ডার, স্বাধীনতার আগে ফরিদপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন ও ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর বিজয়ী পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এমন নানা অধ্যায় নিয়ে তিনি এবার ১১তম বারের মতো সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট (জেপি) প্রার্থী হয়েছেন।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে বোয়ালমারী প্রেসক্লাবের সঙ্গে স্থানীয় পত্রিকা আল-হেলাল স্কয়ার এবং রাতে বোয়ালমারী বার্তা টাওয়ারে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন শাহ জাফর।
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক সমীকরণ। বিএনপি, জামায়াত, ঐক্যফ্রন্ট (জেপি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কৌশল, হিসাব-নিকাশ আর নীরব ভোটের সমীকরণে নির্বাচনটি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। তবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

সেখানে তিনি বলেন,“আওয়ামী লীগ বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করে যে ভুল করেছিল, এবার আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করাও একই ভুল। এই ভুলের ফল যারা সরকারে যাবে, তাদেরও ভোগ করতে হতে পারে।”
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা উচিত হয়নি। কারণ, এখনো দেশে আওয়ামী লীগের একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে, যারা কোনো অপরাধ করেনি।
“যদি সেই দলের কর্মী সমর্থকেরা ভোট দিতে পারে, তবে প্রার্থী হতে পারবে না কেন? অপরাধীদের বিচার হোক, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিয়েই নির্বাচন হলে জনগণই ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দিত,”-মন্তব্য করেন তিনি।
বারবার দল বদলের বিষয়টি স্বীকার করে একাধিকবারের সাবেক এমপি শাহ জাফর বলেন, রাজনীতিতে দল বদল করলেও এতে এলাকার মানুষের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং এরশাদ সরকারের সময় তিনটি উপজেলায় নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে।
“আমার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কারো জমিজমি দখল করিনি-এ কথা আমার এলাকার মানুষ বলতে পারবে,” বলেন তিনি।
নির্বাচনী মাঠে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, তাঁকে ও তাঁর সমর্থকদের মামলা-গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হচ্ছে। “আমি রাজপথের মানুষ। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। নির্বাচনে আছি, থাকব,”-দৃঢ় কণ্ঠে বলেন তিনি।
একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে শাহ জাফর বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের পর ১০ মার্চ ফরিদপুর অম্বিকা ময়দানে পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। “মৃত্যুকে মেনে নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম সেদিন”।
চারবার সংসদ সদস্য হয়েও অর্থসম্পদ গড়তে পারেননি দাবি করে তিনি বলেন, রাজনীতি করেছেন মানুষের জন্য, ব্যবসার জন্য নয়। নির্বাচনে পাওয়া অনুদান ও পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করেই রাজনীতি চালিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ,
প্রবীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মতে, শাহ জাফর একজন পুরানো খেলোয়াড়। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় বিএনপির প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলাম, জামায়াতের প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লার নীরব ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে ভোট বিভাজনের মধ্যেও তিনি অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে পুঁজি করে মাঠে টিকে আছেন। তবে তরুণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক সাড়া রয়েছে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, ফরিদপুর-১ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৭ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। বর্তমানে ৮ জন প্রার্থী বৈধ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা,
১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগ (মালেক) থেকে প্রথম এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বাকশাল, জাতীয় পার্টি ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও জোটের প্রার্থী হিসেবে মোট ১০টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি চারবার বিজয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনএম থেকে অংশ নিয়ে প্রায় ২০ হাজারের বেশি ভোট পান।
ভিন্নমতও রয়েছে,
শাহ জাফরের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলা শাখার সাবেক সদস্য সচিব সোহেল রানা বলেন, “গণহত্যাকারী কোনো দলের সাফাই গাওয়া গণতন্ত্রবিরোধী। একটি দল ছাড়া সরকার টিকবে না-এই ধারণা জনগণকে ছোট করে দেখা হচ্ছে বলে মনে করি”।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১০ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে একজন হিজড়া ভোটারও রয়েছেন। ১৯৭টি কেন্দ্রের ১ হাজার ৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
