স্টাফ রিপোর্টার:
ফরিদপুরে বাকিয়ার রহমান সুমন (৪০) নামে জাহাজের এক সুকানির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি- পিটিয়ে হত্যা করে গলায় রশি নিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। তবে মরদেহটির গলায় কোনো দাগ নেই এবং মাথার কপালের অংশে গভীর ক্ষত রয়েছে বলে পরিবারটি দাবি করেছেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিতে গেলে ২৬ ঘন্টায়ও অভিযোগ নেয়নি পুলিশ।
নিহত বাকিয়ার রহমান সুমন নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের পুরাতন ধানাইড় গ্রামের মৃত ইমার উদ্দিন মোল্যার ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ‘আলতাফ শেখ’ নামের একটি জাহাজে সুকানি হিসেবে কাজ করতেন এবং পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন।
জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুর জেলা সদরের ডিক্রিরচরের সিএন্ডবি ঘাট এলাকায় ‘আলতাফ শেখ’ নাম জাহাজ থেকে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা এসে কোতয়ালী থানা পুলিশকে জানায় এবং পুলিশ সুরতহাল শেষে মর্গে প্রেরণ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, গতকাল দুপুরে জাহাজটির আব্বাস নামে এক স্টাফ তাঁর পরিবারকে ফোন করে জানায়- সুমন গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। খবর পেয়ে দুপুর পৌনে দুইটায় হাসপাতালে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্যরা এবং তাঁরা কোতয়ালী থানা পুলিশকে খবর দেন। পরে ময়না তদন্ত শেষে আজ শুক্রবার বিকাল ৫ টায় বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় পরিবারের সদস্যরা।
এ ঘটনায় নিহতের মামা ওসিয়ার শেখ দাবি করে বলেন, গতকাল আমাকে ফোন করে জানায়- আমার ভাগনে গলায় রশি নিয়ে মারা গেছে। তখনই আমি এসে দেখি হাসপাতালে। তাঁর গলায় কোনো দাগ নেই, মাথায় আঘাত রয়েছে, সেখান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তাকে মার্ডার (হত্যা) করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থলে গিয়ে গলায় রশি নেওয়ার কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় আমরা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাই এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওয়তায় আনার দাবি জানাই।
তাঁদের ধারনকৃত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিহতের কপালে গভীর ক্ষত রয়েছে। এছাড়া মরদেহের গলায়ও কোনো দাগ নেই। বিষয়টি নিয়ে জানতে আজ দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বরত এক নার্স জানান, জরুরী বিভাগে মরদেহটি আনা হয়নি, সরাসরি মর্গে নেয়া হয়েছে। এছাড়া তাঁদের খাতায়ও রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি বলে জানান।
এছাড়া নিহতের বোন আয়েশা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর থেকে বার বার থানায় গেলে পুলিশ আমাদের সাহায্য করতে চাই না। তাঁরা জানায়, আমার ভাই আত্মহত্যা করেছে। এমনকি কোনো অভিযোগও নিতে চাচ্ছে না। আজ বিকালে পুলিশ এসে হাসপাতালের কাগজে লিখে দেয়- মদপান করে মারা গেছে। এসব পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে, আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু পুলিশ আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। আমার ভাই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানাই।
তবে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেন জাহাজটির মালিক মো. শুভ শেখ। তিনি বলেন, গত বুধবার আমাকে ফোন দিয়ে জানায় জাহাজে ঝামেলা করতেছে, লোড দেয়া যাবে না। এরপর থেকে সে ঘাটে ভিড়িয়ে জাহাজ নিয়ে শুধু ঘুরতে থাকে। পরে আমি আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করলে সে আমাকে জানায়- সুমন কি যেন খেয়ে মাতলামি করতেছে, জাহাজ ঘাটে নিতেছে না। এরপর আবারও তাকে ফোন দিলে আমাকে বলে, এক স্টাফ সিগারেটের সাথে কি যেন খাইয়েছে। এরপর গতকাল দুপুরে জানতে পারি, জাহাজের ইঞ্জিনরুমের মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তাঁর গলায় কাপড় পেচানো ছিল এবং মাথা ফাটা ছিল। স্টাফরা আমাকে জানিয়েছে, ইঞ্জিনরুমে গলায় ফাঁস নিতে গিয়ে ১০ ফিট ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটেছে। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন (সদর সার্কেল) বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে পরিবার এসেছিল কিন্তু অপমৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগ হয়নি। অভিযোগ নিলে কাউকে ধরে আনলে সেও হয়রানির শিকার হবে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
