মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন:
বর্তমান বিশ্ব এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের ওপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রাধান্য ছিল দৃঢ়, এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। এর পরিবর্তে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে এশিয়া—বিশেষত চীন, ভারত এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো—ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালন করছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনসংখ্যাগত শক্তি এবং কৌশলগত অবস্থান বিশ্বব্যবস্থায় এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। পাশাপাশি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এবং ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সুযোগ সৃষ্টি করছে।
এশিয়াকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ একদিকে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বজায় রাখছে। এই “ব্যালান্সিং” কৌশল বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে এটি বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে, পেট্রোডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমে গেলে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে নতুন মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। তবে এটি একই সঙ্গে সুযোগও তৈরি করতে পারে, যেমন আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের খরচ কমানো।
তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশে এখনও আয়বৈষম্য, কর্মসংস্থান সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যা বিদ্যমান। যদি নতুন বিশ্বব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করে, তবে তা বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের সুফল আরও বেশি গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়াকে একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত করতে পারে। চীন-ভারত সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল এবং অন্যান্য শক্তির উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি, যা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।
সুতরাং, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে অবস্থান করছি, যেখানে প্রতিটি পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনা ও ঝুঁকি উভয়ই সৃষ্টি করছে। আমরা দেখছি, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি—এবং প্রত্যাশা করছি যে এই পরিবর্তনগুলো যদি নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কাজ করে, তবে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী mahbubhossain786@yahoo.com
