মাহবুবুল হাসান পিংকু:
ইতিহাস কখনো হঠাৎ করে তৈরি হয় না। ইতিহাস জন্ম নেয় মানুষের কান্না, রক্ত, আর বুকভাঙা আর্তনাদের ভেতর দিয়ে। ২০২৪ সালের সেই জুলাই ছিল তেমনই এক সময়—যেখানে রাজপথ শুধু ইট-পাথরের ছিল না, ছিল মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ।
সেদিন যারা রাজপথে নেমেছিল, তারা কেউ রাজনীতিবিদ ছিল না, কেউ ক্ষমতার ভাগ চায়নি। তারা ছিল এই দেশের সাধারণ সন্তান—কারো মা অপেক্ষায় ছিল, কারো বাবা ফোনের ওপারে শেষবারের মতো বলেছিলেন, “সাবধানে থাকিস।” কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো, সবাই আর ঘরে ফিরতে পারেনি। কারো রক্ত শুকিয়ে গেছে রাজপথের ধুলায়, কারো স্বপ্ন চাপা পড়েছে সময়ের নির্মম স্তব্ধতায়।
তবুও সেই রক্ত বৃথা যায়নি। স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে জাতি আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। বহুদিন পর মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিল—এই দেশ আবার মানুষের হবে, এই রাষ্ট্র আবার জনগণের কাছে ফিরে আসবে। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, ছিল কোটি মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা প্রত্যাশার প্রতীক।
কিন্তু স্বাধীনতার পথ কখনো মসৃণ হয় না। ইতিহাস বলে, প্রতিটি পরিবর্তনের পরই অদৃশ্য অন্ধকার মাথা তুলে দাঁড়ায়। যারা আলো সহ্য করতে পারে না, তারা ছায়ার আড়ালে থেকে ষড়যন্ত্র বুনে। বিভ্রান্তি ছড়ায়, অবিশ্বাস তৈরি করে, মানুষের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। কারণ তারা জানে, জনগণ যদি সত্যিই জেগে ওঠে, তবে তাদের আর কোনো আশ্রয় থাকবে না।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। এই দেশের মা তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েও মাথা নত করেনি। এই দেশের নেতা কারাগারের অন্ধকারেও বিশ্বাস হারাননি। এই দেশের তরুণ বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখা যায় না।
আজ যখন রাজপথে মানুষের চোখে আবার স্বপ্নের আলো দেখা যায়, যখন নেতা ও জনগণের দূরত্ব কমতে শুরু করে, তখন বোঝা যায়—ইতিহাস আবার নতুন করে লিখিত হচ্ছে। একজন নেতা তখনই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, যখন তিনি ক্ষমতার দেয়ালের আড়ালে নয়, মানুষের কাতারে দাঁড়ান; যখন প্রটোকলের নিরাপত্তা নয়, জনগণের ভালোবাসাকে নিজের শক্তি মনে করেন।
বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভুল করার সুযোগ আর নেই। এই জাতি অনেক প্রতারণা দেখেছে, অনেক মিথ্যা শুনেছে। তাই এখন তারা চেহারা নয়, সত্য দেখতে চায়; প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবতা দেখতে চায়।
একটি কথা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—নেড়ে বেলতলা একবারই যায়। জনগণ একবার জেগে উঠলে তাকে আর প্রতারণা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না। ভয় দেখিয়ে, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, কিংবা মবের উন্মাদনা সৃষ্টি করে কিছু সময়ের জন্য পথ রোধ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের স্রোত থামানো যায় না।
কারণ এই দেশের মাটি শুধু মাটি নয়—এখানে শহীদের রক্ত মিশে আছে। এই দেশের বাতাস শুধু বাতাস নয়—এখানে মায়ের কান্না ভেসে আছে। এই দেশের মানুষ শুধু মানুষ নয়—তারা ইতিহাসের নির্মাতা।
আর ইতিহাস কখনো বিশ্বাসঘাতকদের মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে তাদের, যারা অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, যারা ভয়কে জয় করেছিল, যারা ভালোবেসেছিল তাদের মাতৃভূমিকে—নিজের জীবনের চেয়েও বেশি।
