ফরিদপুর :
ফরিদপুর শহরতলীর সিএন্ডবি ঘাটে ও শহরের রথখোলা পল্লীতে যৌনকর্মী নিপীড়ন, সম্মতি না নেওয়া ও আইনি সেবা বঞ্চনা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
সিএন্ডবি ঘাটে ও রথখোলা পল্লীতে মোট প্রায় সাড়ে চারশ’ যৌনকর্মীর বসবাস। ফরিদপুর সদরের ওই দুটি যৌনপল্লীতে প্রতিদিন তারা জীবন-জীবিকার তাগিদে কাজ করে আসছেন। তাদের মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। ফলে পল্লী দুটিতে বড়ছে অপরাধ প্রবনতা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কিছু বেসরকারি সংস্থা যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা নিয়ে কাজ করছে, তবু সামগ্রিকভাবে তাদের সুরক্ষা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে সি এন বি ঘাট ও রথখোলা যৌনপল্লীর নারীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কিশোরী পাচার প্রতিরোধে কর্মরত (বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা) শাপলা মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক চঞ্চলা মন্ডল জানান, সি এন বি ঘাটে বর্তমানে ১৯০ জন এবং রথখোলা পল্লীতে ২৪০ জন যৌনকর্মী বসবাস করেন। এক যুগ কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘বর্তমানে নারী ও শিশু অন্য এলাকা থেকে ওই দুটি পল্লীতে পাচার হয়ে আসার হার কমলেও যাদের দেহ বিক্রি করা টাকয় পল্লীর বাড়ীওয়ালী ও সর্দারনীরা চলেন সেই অসহায় ও দরিদ্র যৌন কর্মীদের অধিকার সংকট – সেবা বঞ্চনার অবসান হবে কবে? তিনি বলেন, মানবাধিকার কর্মীদের মতে, যৌনকর্মীরা সমাজের বৈষম্য ও কটূক্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পরিবেশ তাদের অধিকার হলেও, এখনো সেই সুরক্ষা কাঠামো কার্যকর হয়নি।
যৌনকর্মীদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে সঠিক সম্মতি ছাড়াই দৈহিক সম্পর্কে জোরপূর্বক জড়ানো হয়। নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ও প্রশাসনের কাছ থেকে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সুবিধা ও অদকিার বঞ্চিত ওই নাগরিকরা সঠিক সময়ে অভিযোগ নিয়ে সঠিক ব্যাক্তি বা কতৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতেই পারে না, অনেক সময় পল্লীর বাড়ীওয়ালী ও সর্দারনীরা তাদের অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, অনেকে আবার ভয় ভীতিও দেখান।
শহরতলীর সিএন্ডবি ঘাটের একজন যৌনকর্মী ( ছদ্ম নাম সোনিয় আক্তার, বয়স ২৬) বলেন , “আমাদের জীবনে নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। অনেকে জোর করে সম্পর্ক করে, প্রতিবাদ করলে মারধর করে। অথচ থানায় গেলে আমাদের কথাই কেউ শোনে না।”
রথখোলা যৌনপল্লীর আরেকজন বলেন, “সম্মতি ছাড়া আমাদের ব্যবহার করা হয়। আমরা যখন প্রতিবাদ করি, তখন বলা হয় এটা তো আমাদের কাজ। কিন্তু কাজ আর নিপীড়ন কি এক জিনিস?”
ফরিদপুরের নারী ও মানবাধিকার কর্মী তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি এ প্রসঙ্গে বলেন, “যৌনকর্মীদেরও একজন নাগরিকের মতো অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্ক জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। তাদের আইনি সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যৌনকর্মীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালী না হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চরম ঝুঁকিতে থেকে যাবে।
