হাবিবুল্লাহ ফাহাদ, ফ্রান্স :
কিংবদন্তি রঘু রাই বাংলাদেশের বন্ধু। তাঁর আলোকচিত্র মনে করিয়ে দেয় বাঙালিদের উপর কি বিভৎস-নির্মম-ভয়াবহ অত্যাচার চালিয়েছিল পাকিস্তানিরা–
অনন্তে পাড়ি দিলেন ভারতের অন্যতম খ্যাতিমান চিত্র-সাংবাদিক রঘু রাই। মহান মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য সব ছবি তুলেছেন তিনি। যে ছবি নাড়া দিয়েছিল বিশ্বময়।
অসহায় নারী, শিশু ও প্রবীণদের সেইসব দুঃসহ জীবনের চিত্র আমাদের অশ্রুসিক্ত করে আজও।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অকৃত্রিম অবদান স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে।
অবিভক্ত পঞ্জাবের (বর্তমানে পাকিস্তান) ঝাং-এ জন্মগ্রহণকারী রঘু রাই ১৯৬২ সালে ‘দ্য স্টেটসম্যান’- এর মাধ্যমে ফটোগ্রাফিতে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন।
এরপর শুরু হয় এক অসাধারণ কর্মজীবন, যা ভারতীয় ফটোসাংবাদিকতাকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যায়।
টাইম, লাইফ, জিও, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক এবং দ্য সানডে টাইমস-সহ বিশ্বের কয়েকটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনায় তাঁর কাজ উঠে এসেছে।
যুদ্ধ, নির্বাচন, দুর্যোগ, পথজীবন এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে রাইয়ের ছবি প্রতিটি ফ্রেমে ধারাবাহিকভাবে গভীরতা, মর্যাদা এবং পরিপ্রেক্ষিত ফুটিয়ে তুলেছে।
রোববার নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হন রঘু রাই। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে ফেরা এবং রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যও ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন রঘু রাই। তার তোলা ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে আছে।
সেইসব শক্তিশালী আলোকচিত্রের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।
২০১৯ সালে আলোকচিত্র জগতের অন্যতম শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মান ‘অ্যাকাডেমি ডেস বিউক্স-আর্টস ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ পান রঘু রাই। ২০১৭ সালে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাকে আজীবন সম্মাননা দেয়।
১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের ঝাং (বর্তমান পাকিস্তানে) অঞ্চলে জন্ম রঘু রাইয়ের জন্ম। পেশাজীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু পরে জীবিকা আর শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ক্যামেরাকেই বেছে নেন।
২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আলোকচিত্রী হিসেবে তার যাত্রা শুরু। সেই পথ ধরে এক সময় তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি পান।
স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে দিল্লির ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন রঘু রাই। ১৯৭৬ সালে তিনি পত্রিকার চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন।
১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’র জুরি মেম্বার ছিলেন।
ইনডিয়া টুডে লিখেছে, সাধারণ বিষয়ের মধ্যে ‘অসাধারণ’ কিছু খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা রঘু রাইকে করে তুলেছিল অনন্য। ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁক তিনি তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন।
বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসঁ ছিলেন রঘু রাইয়ের মেন্টর বা দীক্ষাগুরু। রাইয়ের কাজে মুগ্ধ হয়ে ব্রেসঁ ১৯৭৭ সালে তাকে ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ যোগদানের সুপারিশ করেছিলেন। ম্যাগনাম বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র সংস্থা, যেখানে কেবল বিশ্বসেরা আলোকচিত্রীদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এনডিটিভি লিখেছে, রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রকে আধুনিক ভারতের এক অনন্য ‘ভিজ্যুয়াল রেকর্ড’ বা প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয় ‘ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি’র পর তার তোলা ছবিগুলো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। পাশাপাশি তিনি খুব কাছ থেকে মাদার টেরিজা ও ইন্দিরা গান্ধীর মত প্রখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি তুলেছিলেন, যেগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়।
কেবল ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তও তার লেন্সে অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে। ভারতের রাস্তাঘাট আর গঙ্গা নদী নিয়ে তার তোলা ছবিগুলোও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে।
আলোকচিত্র বিষয়ক লেখালেখিও তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ‘রঘু রাই’স ইন্ডিয়া: রিফ্লেকশনস ইন কালার’ এবং ‘রিফ্লেকশনস ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ আলোকচিত্র নিয়ে তার ভাবনা ও দর্শণকে ধারণ করেছে।
