স্টাফ রিপোর্টার:
আরেকবার সোনালী যুগ আসার সময় এসেছে জি আই পণ্য ফরিদপুরের পাটের। ফরিদপুরের পাট এর ঐতিহ্য আর সুনাম হারাতে বসেছিল, শীঘ্রই ফিরবে এর জৌলুস।

ফরিদপুরের পাটের জি আই পণ্যের স্বীকৃতি থেকে বৈশ্বিক সম্ভাবনা বিষয়ক দিন ব্যাপী এক কর্মশালায় কৃষি বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এসব কথা বলেন।
ফরিদপুরে পাটের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি এবং বৈশ্বিক বাজারে এর সম্ভাবনা নিয়ে আজ শুক্রবার দিনব্যাপী ফরিদপুরের ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI) এর উদ্যোগে আয়োজিত ওই কর্মশালায় পাটের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, GI স্বীকৃতির গুরুত্ব এবং রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. রাশিদা ফেরদৌস।সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম মাহবুব আলী।
আলোচনায় বক্তারা দেশের ৬০ নং জি আই পণ্য ফরিদপুরের পাট কে বিশ্বের দরবারে আরো পরিচিত করতে এর ব্র্যান্ডিং এর উপর জোর দেন। তারা বলেন, জি আই পণ্য ফরিদপুরের পাট এর ঐতিহ্য আর সুনাম হারাতে বসেছিল, শীঘ্রই ফিরবে তার জৌলুস ।
ফরিদপুর জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান ‘সোনালী আশে ভরপুর ভালোবাসি ফরিদপুর’ এর সার্থকতা মিলেছে জি আই পণ্য হিসেবে ফরিদপুরের পাটের স্বীকৃতি। তবে বক্তারা পাট বীজ, বিশেষ করে সবুজ সোনা নামে পরিচিত বিজেআরআই তোষা পাট ৯ এর বীজ সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, কৃষক পর্যায়ে এই বীজ উৎপন্ন করা না গেলে এযাবৎকালের সেরা উদ্ভাবন এই জাতটি মাঠের টিকে থাকতে পারবে না । ভারত থেকে যে বীজ আমদানি করা হয় সেগুলোর জাত জিআরও- ৫২৪। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সবুজ সোনা পাট আবাদ করতে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করলেও এর বিপরীতে বিএডিসি জিআরও-৫২৪ জাতের বীজ সরবরাহ করে আসছে, এই সমন্বয়হীনতা দূর করা প্রয়োজন।
সেখানে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. আবদুছ ছালাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. খায়ের উদ্দিন মোল্লা।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, ফরিদপুরের পাটের ঐতিহ্য, উৎকৃষ্ট মান ও বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে GI স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটকে বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন জিআরও -৫২৪ থেকে সবুজ সোনা জাতটি অধিক খরা সহিষ্ণু, কিন্তু এই জাতের বীজ আমরা কৃষকদের দিতে পারছি না।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক শাহাদুজ্জামান বলেন, বিজেআরআই যে ৫৫টি জাত এযাবৎ দিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো সবুজ সোনা, কিন্তু এর বীজ হয় রবি মৌসুমে। তখন কৃষক বীজ উৎপাদন করতে চায় না, এজন্য কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে বীজ উৎপাদনে উৎসাহিত করতে হবে, না হলে এই জাত পাঁচ ছয় বছর পর মাঠ থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
সবুজ সোনা জাতের অন্যতম উদ্ভাবক বিজ্ঞানী ড. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সবুজ সোনা ৯০ থেকে ১০০ দিনে ফলন দেয়, ১০০ দিনে প্রতি হেক্টরে ৩ টন পাট হয়, ১২০ দিন রাখতে পারলে সাড়ে তিন টন পর্যন্ত হয়। এত ভাল জাত আগে উদ্ভাবিত হয়নি, সেটিকে বিস্তৃত করতে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বিএডিসি এবং গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরী। তাহলে এই যুগান্তকারী জাতের মধ্য দিয়েই পাটের সেই সুদিন ফিরে আসবে, ফরিদপুর অঞ্চল ফিরে পাবে পাটের হারানো গৌরব এবং ঐতিহ্য।
পাটজাত পণ্যের উদ্যোক্তা এস এম গোল্ডেন গ্রিটের মাশফিকা জামান বলেন, শুধু জি আই পণ্যের স্বীকৃতি পেলে হবে না সেটিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ফরিদপুর অঞ্চলের পাটের মান ভালো রাখতে হবে, প্রবাহমান পানিতে পাট জাগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, তা না হলে ভালো পণ্য তৈরি করা যাবেনা, রপ্তানি আয় বাড়বে না।
পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক নার্গিস আক্তার বলেন, রংপুর দিনাজপুরে আমরা যখন যাই সেখানে দেখি অনেক পাট পণ্যের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে ফরিদপুরের পাটের অনেক কদর রয়েছে। পরিবেশ বান্ধব উদ্ভাবনী কাজের জন্য আমরা গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরিবেশ পদক পেয়েছি। পরিবেশ দূষণ রোধ করতে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পাট থেকে পেপার পাল এবং তা থেকে কাগজ তৈরি করার নির্দেশনা দিয়েছেন আমাদের। অফিস আদালতের পর্দা, স্কুল ব্যাগ এসব ক্ষেত্রে পাট পণ্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে । আশা করা যায় শীঘ্রই পাটের সুদিন ফিরবে, ফরিদপুরের পাশাপাশি সারাদেশে গোল্ডেন ফাইবারের সুনাম আবার ফিরে আসবে। তবে তার জন্য সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা দরকার। বিএডিসি তাদের মত কাজ করে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলোর সাথে সমন্বয় বা পরামর্শ করে না, এখান থেকে ফিরতে হবে তাদেরকে। এবছর ৩৫০ কেজি সবুজ সোনা পাটের বীজ তাদের নেওয়ার কথা ছিল আমাদের কাছ থেকে, কিন্তু নিয়েছে মাত্র ৬৭ কেজি। ভাল জাত যদি তারা কৃষকের কাছে ছড়িয়ে না দিয়ে শুধু ব্যবসার চিন্তা করে তাহলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রধান অতিথি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. রাশিদা ফেরদৌস তার বক্তব্যে বলেন, দেশে ৬০ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। যারা ভালো পাট বীজ উৎপাদন করছেন তা বিপনণে সহায়তা না করে আমরা অনেকেই ঠিক কাজ করছি না।
তিনি ফরিদপুরের কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ফরিদপুর থেকেই শুরু হোক পাট বীজ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রক্রিয়া, যেহেতু ফরিদপুরের পাট জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে , তাই তাদের দায়িত্ব বেশি। এটি জি আই পণ্য হওয়াতে ফরিদপুরবাসী অনেক বড় সম্মানিত হয়েছে।
এ কর্মশালায় কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, গবেষক, উদ্যোক্তা, পাট চাষি এবং সংশ্লিষ্ট জন অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় পাটের উৎপাদন, সংরক্ষণ, মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
