ট্যুরিস্ট ভিসায় ঢাকা থেকে ইলেক্ট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) নিয়ে গত জুন মাসে কলম্বো যান সাইফুর রহমান। কলম্বোর বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন লাইনে তিনিসহ আরও ৫ জন বাংলাদেশিকে আলাদা করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন সেখানকার ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তা। জিজ্ঞাসাবাদের এক ফাঁকে ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসার অপব্যবহার করছেন, তাই এই জেরা। সাইফুর রহমান জানান, বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়া অন্য কাউকে এমন জেরার মুখে পড়তে হয় না।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইমিগ্রেশনে জেরা করা বেড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন সেসব দেশে ভ্রমণকারীরা। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করা ব্যক্তি, এমনকি ভ্রমণের মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা ট্রাভেল ব্লগাররাও পড়েছেন ইমিগ্রেশনের জেরার মুখে। তাই ভ্রমণপ্রেমী কিংবা কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন—বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনও দেশের পাসপোর্ট নিয়ে এমন হয়রানির মধ্যে পড়তে হয় না। এমনকি নিয়মিত যারা বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যান, তারাও হয়রানির মধ্যে পড়েন।
জনপ্রিয় ট্রাভেল ব্লগার নাদির নিবরাস সম্প্রতি পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপ রাষ্ট্র সেশেলস ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ইমিগ্রেশনে এক অদ্ভুত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হন বলে তার ফেসবুক পেজ ‘নাদির অন দ্য গো- বাংলা’-তে প্রকাশ করেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি লেখেন, ‘অনেক দিন ধরে ভ্রমণ করতে করতে আমি জানি, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে গেলে বাড়তি চেক সব সময়ই থাকে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগে সেশেলসে ঢোকার সময় ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো। আমাকে আর আমার স্পেন থেকে আসা এক বন্ধু, যার পরিবারের সবাই স্পেনের বংশোদ্ভূত, তাকে এক ঘণ্টার বেশি আটকানো হলো। ফোন করে সব হোটেল বুকিং চেক করলো। আর শুধু আমার সেশেলস থেকে মাদাগাস্কার যাওয়ার ফ্লাইট থাকাটা তাদের যথেষ্ট মনে হয়নি। মাদাগাস্কার থেকে পরের দেশের ফ্লাইটও সঙ্গে সঙ্গে দেখাতে হবে বললো। তখনও আমি মরিশাসের ভিসার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তাই ওটা ছিল না। বাধ্য হয়ে তখনই মাদাগাস্কার থেকে মরিশাসের একটা টিকিট কিনতে হলো, পরে সেটা ক্যানসেল করতে হয়েছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আরও অদ্ভুত ছিল যে, আমার ওই স্পেনের বন্ধুর সঙ্গেও ঝামেলা করলো। অথচ স্প্যানিশ পাসপোর্ট তো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টগুলোর মধ্যে একটা। আমাদের ফ্লাইটে অন্য স্প্যানিশরা কোনও ঝামেলা ছাড়াই ঢুকে গেলো। কিন্তু সে যেহেতু আমার সঙ্গে ছিল, তাকে ব্যাংক ব্যালেন্স দেখাতে হলো—এমনকি এটিএমে গিয়ে টাকা তুলে প্রমাণ করতে হলো। এত দেরি হওয়ায় আমাদের গাড়ি রেন্টালের বুকিং মিস হয়ে যায়। আর আমাকে ৫০ ইউরো বেশি দিয়ে নতুন গাড়ি নিতে হলো।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এয়ারপোর্ট স্টাফরা ভদ্রই ছিল, আর সেশেলসের মানুষজনও চমৎকার। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো—বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা অনলাইন ভিসা দেওয়া দেশে ঢুকতে গেলে প্রায়ই এই ধরনের বাড়তি ঝামেলা, সময় নষ্ট আর অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হতে হয়— এমনকি সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও।
বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টের বিড়ম্বনা প্রসঙ্গে সুপরিচিত ট্রাভেল ব্লগার শিশির দেব বলেন, ‘আমি অনেক দেশেই দেখেছি, সাধারণ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি সেদেশ থেকে বের হওয়ার সময় ফ্লাইটে ওঠার আগ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার পাসপোর্ট, বিশেষ করে ভিসা চেক করা হয়। তবে আমি যেহেতু ট্রাভেল ব্লগ করি, ইউটিউবার পরিচয় শুনে আমাকে তেমন কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। যদিও আমার সঙ্গেই লাইনে দাঁড়ানো অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে এমনটা হতে দেখেছি।
