স্টাফ রিপোর্টার:
পিঁপড়ার সমাজ মানেই আমরা সাধারণত তিন ধরনের সদস্যের কথা ভাবি। রানি, পুরুষ আর কর্মী। কর্মীরাই খাবার জোগাড় করে, বাসা বানায়, বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। বেশির ভাগ পিঁপড়া কলোনি কর্মী ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু জাপানে পাওয়া এক বিশেষ প্রজাতির পিঁপড়া এই চেনা নিয়ম পুরো বদলে দিয়েছে। এই প্রজাতিতে নেই কোনো কর্মী, নেই কোনো পুরুষ। আছে শুধু রানি, আর তারাই নিজেরাই বংশ বাড়ায়। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো মনে হলেও জাপানের গহীন অরণ্যে ঠিক এমনই এক বিচিত্র পিঁপড়ের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
এই অদ্ভুত প্রজাতির নাম ‘টেমনোথোরাক্স কিনোমুরাই’। এটি জাপানে পাওয়া যায় এবং এখন পর্যন্ত পরিচিত পিঁপড়াদের মধ্যে একেবারেই আলাদা। এই প্রজাতির সব সদস্যই রানি। তারা পুরুষের সঙ্গে মিলন ছাড়াই ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে জন্ম নেয় তাদের নিজের মতো আরেকটি রানি।

বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে সন্দেহ করছিলেন যে এই প্রজাতির পিঁপড়েরা হয়তো ভিন্ন কোনো পদ্ধতিতে প্রজনন করে। তবে সম্প্রতি একদল জাপানি ও জার্মান গবেষক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা গবেষণাগারে এই প্রজাতির ৪৩টি রানির ডিম নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালান। সেখান থেকে জন্ম নেওয়া পরবর্তী প্রজন্মের আচরণ পরীক্ষা করে তারা এক বিস্ময়কর তথ্য খুঁজে পান। তারা দেখেন যে এই পিঁপড়েরা ‘পার্থেনোজেনেসিস’ নামক একটি প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করে। এটি এমন এক পদ্ধতি যেখানে কোনো পুরুষ পিঁপড়ের শুক্রাণু ছাড়াই রানি নিজের অনিষিক্ত ডিম থেকে সরাসরি বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। সহজ কথায় বললে এই রানিরা মূলত নিজেদেরই ক্লোন বা হুবহু প্রতিচ্ছবি তৈরি করে চলেছে। পতঙ্গ জগতে এমন ঘটনা মাঝে মাঝে দেখা গেলেও পিঁপড়েদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বিরল।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে একটি কলোনিতে যদি কেবল রানিরাই থাকে তবে খাবার জোগাড় করা, বাসা বানানো, বাচ্চাদের দেখাশোনা করার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো কারা করে? এর উত্তরে লুকিয়ে আছে এই পিঁপড়েদের এক নিষ্ঠুর ও রোমাঞ্চকর কৌশলে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন টেমনোথোরাক্স কিনোমুরি প্রজাতিটি এমন এক পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে যারা আগে অন্য প্রজাতির পিঁপড়েকে দাস বানিয়ে কাজ করাতে অভ্যস্ত ছিল। সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের অলস করে ফেলে এবং এক সময় তাদের সমাজ থেকে শ্রমিক ও পুরুষ জাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরে টিকে থাকার জন্য তারা পার্থেনোজেনেসিসের পথ বেছে নেয়। অর্থাৎ পুরুষ ছাড়াই বংশ বাড়ানোর ক্ষমতা তৈরি করে।
টিকে থাকার জন্য এরা এখন এক ধরণের ‘সামাজিক পরজীবী’ হিসেবে জীবনযাপন করে। এরা মূলত তাদের খুব কাছের প্রজাতি ‘টেমনোথোরাক্স মাকোরা’ এর কলোনি বা বাসায় আক্রমণ চালায়। সেখানে ঢুকে তারা অত্যন্ত কৌশলে ওই কলোনির আসল রানিকে হত্যা করে। এমনকি তারা কলোনির অনেক শ্রমিক পিঁপড়েকেও মেরে ফেলে। এরপর শুরু হয় এক অদ্ভুত শাসন। বেঁচে থাকা শ্রমিক পিঁপড়েরা তখন এই নতুন আক্রমণকারী রানিকে নিজেদের রানি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই শ্রমিকরাই তখন আক্রমণকারী রানির ডিমের যত্ন নেয় এবং তার বাচ্চাদের বড় করে তোলে। অর্থাৎ নিজের কোনো শ্রমিক না থাকলেও অন্যের শ্রমিক ব্যবহার করে তারা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে।
জার্মানির রেজেনসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডক্টর জুরগেন হেইঞ্জ এই বিষয়ে বলেন যে এই পিঁপড়েরা এক সম্পূর্ণ নতুন ধরণের সামাজিক সংগঠনের পরিচয় দেয়। এটি পিঁপড়েদের বৈচিত্র্যময় জগতকে এক নতুন মাত্রা দান করেছে। তিনি মনে করেন এই প্রজাতিটি সামাজিক পরজীবিতার বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ। এটি আমাদের দেখায় যে ক্ষুদ্র এক একটি পতঙ্গ তাদের জীবন বাঁচাতে এবং বংশ রক্ষায় কতটা নমনীয় আর কৌশলী হতে পারে।
পিঁপড়াদের আমরা সাধারণত পরিশ্রমী ও নিয়ম মেনে চলা প্রাণী হিসেবে দেখি। কিন্তু এই প্রজাতি দেখিয়ে দিল, প্রকৃতি সবসময় এক নিয়মে চলে না। টিকে থাকার জন্য কখনো কখনো পুরো কাঠামো বদলে যেতে পারে। কর্মী ছাড়া, পুরুষ ছাড়া শুধু রানিদের একটি সমাজ কল্পনা করা কঠিন। তবু বাস্তবে তা সম্ভব হয়েছে।
প্রকৃতির ভেতরে এখনও কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে। ছোট্ট একটি পিঁপড়াও বিজ্ঞানীদের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে ধরতে পারে। জীবনের নিয়ম আমরা যতটা সহজ ভাবি, প্রকৃতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং বিস্ময়কর।– সূত্র দেশকাল নিউজ
