স্টাফ রিপোর্টার:
মুক্ত গণমাধ্যম দিবসেও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে কর্তৃপক্ষের বাঁধার মুখে পড়েছেন দুই সাংবাদিক। সংশ্লিষ্টরা ওই সাংবাদিকদের জানান, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হাসপাতাল এলাকায় কোনো ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ ও ছবি তোলা যাবে না। তবে হাসপাতালটির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো নির্দেশনাপত্র বা নোটিশ দেখাতে পারেনি তাঁরা। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
রোববার (০৩ মে) দুপুর ২ টার দিকে হাসপাতালটির নতুন ভবনের ক্যাজুয়ালটি ও নিউরোসার্জারী ওয়ার্ডে সংবাদ সংগ্রহে গেলে আনসার সদস্য ও দায়িত্বরত এক চিকিৎসক তাঁদের বাঁধা দেন। ওই দুই সাংবাদিকের মধ্যে রয়েছেন, আজকের পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি হাসান মাতুব্বর (শ্রাবণ) ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরা পার্সন।
বাঁধাপ্রাপ্ত সাংবাদিকরা জানান, ফরিদপুর সদরে একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে যান তাঁরা। এ সময় আহত ব্যক্তির ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে ক্যামেরা বের করলে দৌড়ে এসে এক আনসার সদস্য বাঁধা দেন। এরপর তিনি এক চিকিৎসককে ডেকে আনেন। ওই চিকিৎসক এসে নিজেকে দায়িত্বরত রেজিস্টার হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাঁর নাম ডা. তোফাজ্জেল হোসেন বলে জানিয়েছেন। ওই চিকিৎসক জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া হাসপাতালে ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ করা নিষেধ।
আজকের পত্রিকার প্রতিবেদক বলেন, ‘ওই চিকিৎসক এসেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন আমাদের। তখন তিনি জানতে চান- আপনারা কি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছেন। অনুমতি নিয়ে আপনাদের ভিডিও করতে হবে, এছাড়া ভিডিও করা যাবে না। পরবর্তীতে পরিচালকের কার্যালয়ে গেলে তিনি ঢাকায় আছেন বলে জানান। এরপর উপপরিচালক ডা: মানব কৃষ্ণ কুন্ডুর কাছে গেলে তিনিও অনুমতি দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। তখন তিনি বলেন- পরিচালক স্যার ছাড়া আমরা কিছু বলতে পারব না।
এমন নিয়মের বিষয়ে জানতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুমায়ুন কবির কাছে জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সরকারি হাসপাতালে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে অনুমতির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি-না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান বলেন, আমার জানামতে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা জারি করা হয়নি। তবে রিসার্চের জন্য বা গবেষণার কাজে কোনো তথ্য-উপাত্ত নিতে হলে সেক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।’
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এ ধরনের নিয়মে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ, জেলায় কর্মরত সাংবাদিক ও ফরিদপুর প্রেসক্লাব।
নিন্দা জানিয়ে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ও জিটিভির জেলা প্রতিনিধি শেখ মনির হোসেন বলেন, ‘এভাবেতো সাংবাদিকতা করা যাবে না, ইচ্ছামতো নিয়ম করে সংবাকিদকদের কাজে বাঁধা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালতো স্বাস্থ্য ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, এখানেতো রাষ্ট্রের গোপনীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নয় যে- যেখানে অনুমতি নিতে হবে।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন- ‘সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন পেশা। যেখানে অন্ধকার সেখানে আলো ফেলানো সাংবাদিকদের কাজ। একটি স্বাধীন দেশের হাসপাতালে সাংবাদিকেরা কাজ করতে পারবে না- এটা কালাকানুন। তবে আমার জানামতে, এ জাতীয় নিয়ম বাংলাদেশে নেই। এই আইন যারা করে থাকেন তাঁরা আকন্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকে৷ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেটি করেছে সে বিষয়ে নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এ ধরনের নিয়মের নিন্দা জানিয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপিকা শিপ্রা রায় বলেন- ‘সংবাদ মাধ্যম বা সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা থাকা উচিত। আমরা মুখে স্বাধীনতার কথা বলি কিন্তু বাস্তবে হয় না। হাসপাতালে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত কাজ করে থাকেন, এমন নিয়ম করা আসলেই নিন্দনীয়।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘এমন আইন করা মানে মুক্ত সাংবাদিকতার অন্তরায় এবং গণমাধ্যমের কন্ঠ রোধ করার কৌশল এটি। এ ধরনের আইন করে থাকলে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।’
