স্টাফ রিপোর্টার :
ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলার শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার আওতায় আনতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তাঁর উদ্যোগে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে দুই উপজেলার ১৭৫ জন শিক্ষার্থী। স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত এ উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বৈশ্বিক যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ এপ্রিল নগরকান্দা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিদেশগামী বাংলাদেশিদের জন্য ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে চীনা ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের বিভিন্ন অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। তাঁর সেই বক্তব্যকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইউএনও মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে নগরকান্দায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিনামূল্যে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম।
তবে এই উদ্যোগের সূচনা আরও আগে। সালথা উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে ইউএনও মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পরীক্ষামূলকভাবে একটি কলেজের ২৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে চীনা ভাষার কোর্স চালু করেন। ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর কার্যক্রমটি নগরকান্দার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এ কোর্সে অংশগ্রহণ করছে।
বর্তমানে নগরকান্দার পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন এবং সালথার একটি প্রতিষ্ঠানের ২৫ জনসহ মোট ১৭৫ জন শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে চীনা ভাষা শিখছে।
নগরকান্দায় যেসব প্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো হলো, লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, তালমা নাজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, এম এন একাডেমি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আক্রামুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় এবং কৃষ্ণারডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়। অন্যদিকে সালথার নবকাম পল্লী কলেজের শিক্ষার্থীরাও এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে ওই কলেজ থেকেই কার্যক্রমটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন স্থানীয় দুই সমাজসেবক। নগরকান্দার শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থায়ন করছেন হানিফ মণ্ডল এবং সালথার শিক্ষার্থীদের ব্যয় বহন করছেন ইদ্রিস আলী মোল্লা।
চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাজমুন নাহার পলি। দীর্ঘ ১৬ বছর চীনের গুয়াংঝুতে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বর্তমানে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চীনা ভাষা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। দেশে চীনা ভাষার প্রসারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।
নগরকান্দার শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থায়নকীরী সমাজসেবক ও হানিফ মণ্ডল বলেন, ফরিদপুরের শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা ভাষা প্রশিক্ষণের এই ব্যতিক্রমী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে, আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এমন সুযোগ সৃষ্টি করা দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয়। এই মহৎ উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত। উদ্যোগটির সফলভাবে বাস্তবায়নে অবদান রাখা মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। আশা করি এ কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তাকারী সমাজসেবক ইদ্রিস আলী মোল্লা বলেন, গ্রামের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ কোর্সের অন্যতম বিশেষত্ব হলো চীনে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সরাসরি অনলাইন ক্লাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বর্তমানে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনরত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান করছেন। পাশাপাশি ঢাকার লিড একাডেমির প্রশিক্ষকরাও ক্লাস পরিচালনা করছেন। ফলে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের ভাষা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে ইউএনও মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বিশ্বে চীনা ভাষার গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ ভাষা জানা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। আমি বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, গ্রামীণ পর্যায়ে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের আরও দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
