বিশেষ প্রতিবেদক:
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত থেকে ছাত্রলীগ কর্মী প্রান্তর আটকের মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ভাবে ভাইরাল হয়েছে।
গত ২১ জুন বিকেল ৫টার দিকে ওই প্রান্তকে আটক করে ডিবি। অভিযোগ এসময় তাকে তাঁর মায়ের সামনেই প্রহার করা হয়। ডিবির হেফাজতে অস্থুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুন রবিবার সকাল ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ভাইরাল হওয়া ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডর ওই ভিডিওতে দেখা গেছে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত (২৭) মধুখালী উপজেলার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লা এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে নিজ বাড়ির সমনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি (লুঙ্গি পরিহিত) ও তাঁর কাধে একটি ল্যাপটপের ব্যাগ রয়েছে। ওই ভিডিওতে প্রান্ত বাদে আরও তিনজন ব্যক্তি ছিলেন। যারা ডিবি পুলিশ দলের সদস্য এবং ওইদিন এ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ওই তিন ব্যক্তির মধ্যে একজন লাল রঙের টি শার্ট পরিহিত ডিবি সদস্য । তিনি প্রথম প্রান্তর গতি রোধ করেন, ঠেলা ধাক্কা দেন এবং কিছু বলার চেষ্টা করেন। এ সময় সাদা রঙের টি শার্ট পরিহিত ডিবি পুলিশের আরেক সদস্য এসে এক হাত দিয়ে প্রান্তর কোমর ধরে এবং ইশতিয়াককে কিছু বলতে দেখা যায়।

ভিডিওর ১৪ সেকেন্ডে প্রান্তকে তার দুই হাত দিয়ে দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ভিডিওর ৩৬ সেকেন্ডের “মাদারচোত” বলে প্রান্তর মাথায় হাত দিয়ে আঘাত করে সাদা রঙের টি শার্ট পরিহিত ডিবি সদস্য । ওই সময় লাল রঙের টি শার্ট পরিহিত সদস্য তাকে বাধা দিয়ে বলেন, “মারিস না।”
এ সময় ওই এলাকায় ক্রিম কালারের প্যান্ট ও অ্যাশ কালারের চেক শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি ফুটেজের আওতায় আসেন।
ভিডিওর ৪৩ সেকেন্ডে অ্যাশ কালরের শার্ট পরিহিত ব্যক্তিকে মোবাইল ফোনে, “লাঠি নিয়ে মরিচ বাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন দ্রুত”-একথা বার বার বলতে শোনা যায়।

ভিডিওর এক মিনিট ৩২ সেকেন্ড প্রান্তকে দুই হাত উচু করে ডিবি সদস্যদের সার্চ করতে দেখা যায়। ভিডিওর ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে সিলভার রঙের একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস সেখানে আসে। এ সময় আগের সদস্যেদের সাথে পরবর্তীতে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি (অ্যাশ কালার শার্ট) পরিহিত ব্যক্তি ইশতিয়াককে সার্চ করার কাজে যুক্ত হন। ওই সময় হাইয়েস থেকে নারীসহ আরও কয়েকজন ডিবি সদস্য যোগ দেন।
ভিডিওর ২ মিনিট ৭ সেকেন্ডে প্রান্তকে যেখানে সার্চ করা হচ্ছিল তার কয়েক হাত দূরে বাম দিকে কিছু একটা দেখে অ্যাশ কালারের শার্ট পরিহিত ব্যক্ত চিৎকার কেরে বলে ওঠেন, “এই যে এক টোপলা, এই যে”।
যদিও ওই পুরো সময় ওই দুই সদস্য ইশতিয়াকে সার্চ করছিল তাদের থেকে কিছুটা দূরে হঠাৎই ওই টোপলা সনাক্ত করেন।
এর পরে সাথের অন্য ডিবি সদস্যদের “এই যে”, “এই যে” বলতে শোনা যায়।
ইশতিয়াকের বিধবা মা খাদিজা আক্তার পরবর্তি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, পরে প্রান্তকে নিয়ে ডিবি সদস্যরা বাড়িতে আসেন। বাড়িতে এসে নারী সদস্য দিয়ে তাকেও সার্চ করনো হয়। প্রান্তর ঘর এবং তার ঘরও তাল্লাশি করে তছনছ করা হয়। পরে প্রান্তকে উঠিযে নিয়ে যায়। রাতে ৬৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ইশতিয়াককে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার আত্মীয় সোহেল মুন্সীর সাথে ডিবি পুলিশের কথা হয়। পরে ডিবি জানায় এ ছেলে কলেজে পড়ে, ছাত্রলীগ করে, আজ তাকে ছাড়া হবে না, কাল সকালে এক লাখ টাকা দিয়ে ফরিদপুর আসেন।
কান্না জড়িত কন্ঠে খাদিজা আক্তার বলেন, সকালে আমি এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাই। ছেলে অসুস্থ হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে শুনে আমি হাসপাতালে যাই। গিয়ে আমি আমার ছেলের লাশ পাই । আমার জীবিত ছেলেকে নিয়ে গেল আমার সামনে, এলাকা থেকে, প্রতিবেশিদের সামনে , এইখানে আনার পর জীবিত ছেলেরে মৃত লাশ পেলাম।
ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে প্রান্তর মা খাদিজা আক্তার বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।”
মৃত ওই যুবক মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত ফরিদপুরের মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লার বাসিন্দা মৃত এসকেন হায়দারের ছেলে। দুই ভায়ের মধ্যে মির্জা ইশতিয়াক বড়। তিনি এখনো বিয়ে করেন নি। তিনি ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন
তবে ডিবি পুলিশের দাবি ওই যুবককে নির্যাতন করা হয়নি। তার সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়েছে।
ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর রোববার (২১ জুন) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, গোয়েন্দা শাখা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে তার বাড়ি থেকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ বোধ করেন। তাৎক্ষণিক তাকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ইশতিয়াকের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ সুপার বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি যে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে তার শরীরে কোনো ধরনের জখমের চিহ্ন ছিল না। পুলিশের হেফাজতে তাকে কোনো ধরনের আঘাত বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি
“পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে”-মন্তব্য করে মধুখালী ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর “সঠিক তদন্ত” দাবি করেছেন ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন।
ডিবি পুলিশ হেফাযতে ইশতিয়াকের মৃত্যুর ঘটনাকে “হত্যাকান্ড” হিসেবে দাবি করে মধুখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ সতেজসহ স্থানীয় বিএনপির তিন নেতা এ হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
