স্টাফ রিপোর্টার:
নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাঙ্গা পৌরসভার নূরপুর গ্রামে তারেক মাসুদের গ্রামের বাড়িতে নীরবে-নিভৃতে ক্ষণজন্মা এই নির্মাতার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়।

তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণকালে উপস্থিত ছিলেন তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ, তারেক মাসুদের বৃদ্ধা মা নুরুন্নাহার মাসুদ সহ পরিবারের সদস্যরা।
পুত্রের স্মৃতিচারণ করে তারেক মাসুদের মা নুরুন্নাহার মাসুদ বলেন, “আমার মনে বড় কষ্ট। আমি চেয়েছিলাম তারেকের নামে গ্রামের বাড়িতে একটি জাদুঘর হবে। জাদুঘরটি আমি নিজ হাতে সাজাবো। এটাই আমার একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। তার কিছুই হয়নি। সরকারের কাছে আর কিছুই চাই না। আমার তারেক খাইয়া না খাইয়া ছবি তৈরি করেছে।”
পরে তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ও ভাঙ্গা সরকারি কাজী মাহবুব উল্লাহ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোসায়েদ হোসেন ঢালীর সভাপতিত্বে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।

স্মরণসভায় বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিঞা বেনজীর আহমেদ, সরকারি কাজী মাহবুব উল্লাহ কলেজের শিক্ষক মো. সরোয়ার হোসেন, ভাঙ্গা উপজেলা কৃষক সমিতির সভাপতি আবু বকর, ভাঙ্গা নাগরিক কমিটির সদস্য সুভাষ মন্ডল, তারেক মাসুদের ভাই সাঈদ মাসুদসহ অন্যরা।
তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক মোসায়েদ হোসেন ঢালী বলেন, “তারেক মাসুদ যা চেয়েছিলেন, তার কোনোটিই আমরা পাইনি।” তিনি বলেন, সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার বিপরীতে বর্তমানে সংস্কৃতি জগতে গালিগালাজসহ নানা অপসংস্কৃতি জায়গা করে নিয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাতারা যদি সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার দিকনির্দেশক তারেক মাসুদের চিন্তা-চেতনাকে অনুসরণ করেন, তবেই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে। তিনি ভাঙ্গা বিশ্বরোড গোলচত্বরের নামকরণ ‘তারেক মাসুদ চত্বর’ করার দাবি জানান। বক্তারা বলেন, তারেক মাসুদ শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধতা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওরের জোকা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মাসুদ সহ ৪জন নিহত হন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ। তাঁর নির্মিত ‘মাটির ময়না’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
তাঁর চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র
পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা
মাটির ময়না (২০০২)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বেগের পটভূমিতে তারেক মাসুদের ছেলেবেলার মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে।
অন্তর্যাত্রা (২০০৬)
এটি বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। প্রবাসী জীবন, শিকড়ের সন্ধান এবং আত্মপরিচয়ের জটিলতা এ ছবির মূল বিষয়।
রানওয়ে (২০১০)
২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও জঙ্গিবাদের উত্থানকে কেন্দ্র করে। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সংলগ্ন রানওয়ের কাছে এক বস্তিতে বসবাসকারী রুহুল নামের এক তরুণ ও তার পরিবারকে ঘিরে এগোয় সিনেমার গল্প। এটি তারেক মাসুদের সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি।
প্রামাণ্যচিত্র ও তথ্যচিত্র
আদম সুরত [১৯৮৯]
প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জীবন, দর্শন এবং গ্রামীণ বাংলার আবহ নিয়ে নির্মিত তারেক মাসুদের প্রথম ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে তিলে তিলে তৈরি এ কাজটি বাংলাদেশের স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্র আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তির গান [১৯৯৫]
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা নামের দলের এ সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। সেই সময় এই শিল্পীদের সঙ্গে থেকে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন এই শিল্পীদের সঙ্গে থেকে লেভিন প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। সেই ফুটেজ থেকেই নির্মিত হয় এই প্রমাণ্যচিত্রটি।
ভয়েসেস অব চিলড্রেন [১৯৯৭]
কর্মজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার ও জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা একটি প্রামাণ্যচিত্র।
ইন দ্য নেম অব সেফটি [১৯৯৯]
মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র।
মুক্তির কথা [১৯৯৯]
‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের সময় সাধারণ মানুষের মুখ থেকে উঠে আসা মুক্তিযুদ্ধের ব্যক্তিগত ও নির্মম অভিজ্ঞতার প্রামাণ্য দলিল।
নারীর কথা [২০০০]
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ত্যাগ, বীরত্ব ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার নারীদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত কাজ।
আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড [২০০২]
ঢাকার পথশিশুদের কঠোর বাস্তবতার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ধারণ করা একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রামাণ্যচিত্র।
স্বল্পদৈর্ঘ্য ও অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র
সোনার বেড়ি (১৯৮৫
বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও স্বল্পদৈর্ঘ্য
ইউনিসন (১৯৯২)
একটি অ্যানিমেশন স্বল্পদৈর্ঘ্য
নরসুন্দর (২০০৯)
১৯৭১ সালের পটভূমিতে নির্মিত একটি প্রশংসিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
