স্টাফ রিপোর্টার:
সরবরাহ নেই অথবা অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে- সার নিয়ে কৃষকদের এমন নানা অভিযোগের মধ্যেই সার কারখানায় গ্যাসের দাম দেড়শ শতাংশ বাড়ানোর গণশুনানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি। ফলে সারের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার এবং কৃষক পর্যায়ে এর দাম আরো বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমনের ভরা মৌসুমে সার পেতে চরম ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন অনেক কৃষক। বিশেষ করে, ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি এবং ইউরিয়া সারের জন্য ডিলার পয়েন্ট ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ঘুরে শূন্য হাতে ফেরার অভিযোগ করেছেন অনেকে।
এমনকি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন স্থানীয় অনেকে।
তাদের দাবি, আমনের ভরা মৌসুমে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে। দোকানে দোকানে ঘুরেও চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না।
স্থানীয় একজন কৃষক বলেন, “ডিলার বলে, সার নাই। আমিতো বাজারের দুকানে সার দেখছি, অনেক বেশি দাম দিয়ে বিক্রি হচ্ছে।”
সার নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের এমন অভিযোগ থাকলেও, কোনো সংকট নেই বলে দাবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের।
এদিকে, সার পাওয়া নিয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সার কারখানায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে দেওয়া পেট্রোবাংলার প্রস্তাব নিয়ে আগামী ছয়ই অক্টোবর গণশুনানি আহ্বান করেছে বিইআরসি।
তবে ওই শুনানীতে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব। বিইআরসির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি।
তারা বলছে, লোক দেখানো শুনানিতে অংশ নেবে না ক্যাব।
যদিও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনকে গণশুনানিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “বিইআরসি দাম নাও বাড়াতে পারে কিন্তু আলোচনা তো করতে হবে।”
এছাড়া, সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়লেই যে সারের দাম বাড়বে, এটি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন মি. খান।
সার সংকট:
কুড়িগ্রামের কৃষক আবেদ আলী সরদার। নিজের জমিতে চাষাবাদ করেই জীবন চলে তার। ধানের পাশাপাশি শীতকালিন সবজিরও আবাদ করেন এই কৃষক।
এবছর ভরা আমনের মৌসুমে সার নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তিনদিন ধরে বাজারে ঘুরে শেষমেষ বাড়তি দামেই সার কিনেছেন তিনি।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, “দুই দোকান তিন দোকান ঘুরছি, বাংলা ডিআইবি পাইনি। এক জায়গায় ১৯শ টাকা বস্তা চাইছে, পরে ৩২ টাকা কেজিতে অল্প পরিমাণে কিনছি।”
ওই এলাকার আরেক কৃষক দবির ভূঁইয়া বলছেন, “টাকা দিয়ে সার কেনবো, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। দামের কারণে এখনো জমিতে সার দিবার পারি নাই,” বলেন তিনি।
সম্প্রতি সার নিয়ে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছ থেকেই। কেউ বলছেন সার পাচ্ছেন না, আবার কারো অভিযোগ নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
রাজবাড়ীর কৃষক মো. আকুর মণ্ডল জানান, বস্তাপ্রতি পাঁচশ-ছয়শ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনেছেন তিনি। বেশি টাকা দিয়ে সার কেনার অভিযোগ করেছেন পিরোজপুরের কৃষক রাজন মিয়াও। এমনকি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধেও সিন্ডিকেট করে সারের দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুলছেন কেউ কেউ। একই অভিযোগ ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী, সালথা, নগরকান্দা উপজেলার কৃষকদের।
সব মিলিয়ে দেশে সার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে সারের মোট চাহিদার বেশিরভাগই মূলত আমদানি নির্ভর। দেশের কারখানাগুলোয় উৎপাদিত কিছু ইউরিয়া সার ব্যতিত প্রায় সবই আমদানি করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর।
দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলেই দাবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের। তারা বলছে, প্রতিবছর চাহিদা যখন বেশি থাকে, তখন অতিরিক্ত লাভের আশায় একটা মহল সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রতিটি এলাকায় চাহিদার ভিত্তিতে অনেক আগে থেকেই সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা থাকে।
“আমাদের সারের কোনো সংকট নাই। সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক ভাবেই অব্যাহত আছে,” দাবি করেন মি. ইমাম।
তার দাবি, কেবল সার নয় কৃষি উপকরণ নিয়ে যেসব অসাধু চক্র সিন্ডিকেট করার চেষ্টা করছে সবসময়ই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রণালয় কাজ করছে। — বিবিসি বাংলা
