স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম তোফায়েল আহমেদ। ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে যিনি ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ আর নেই।
সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদের নাম উচ্চারিত হয় মূলত একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় সম্ভবত ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ।
সেই ঘোষণাই পরবর্তীতে বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা এই নেতা ছিলেন উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। মুজিব বাহিনীর চার প্রধান সংগঠকের একজন হিসেবে যুদ্ধকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার সূচনালগ্নেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শিল্প, বাণিজ্য ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তবে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের পরিচয়ের চেয়েও ইতিহাস তাঁকে বেশি স্মরণ করবে একজন আন্দোলনের নেতা এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির ঘোষক হিসেবে।
রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করেছেন তোফায়েল আহমেদ। সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি ছিলেন সক্রিয়।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে অনেকেই তাঁকে স্মরণ করছেন একজন ইতিহাসের সাক্ষী, আন্দোলনের সংগঠক এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাস-সহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই নেতা।
