স্টাফ রিপোর্টার:
সতেরো বছরের কিশোরী মিথিলা আক্তার। পারিবারিক সিদ্ধান্তে অন্যত্র বিয়ের কাবিন হয়েছিলো তাঁর। যার মৃত্যু নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। পরিবার বলছে, জোরপূর্বকভাবে ওই কিশোরীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করে তিন যুবক এবং ঘটনার পরেই আত্মহননের চেষ্টার দেড়মাস পর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এ ঘটনার পাঁচদিনেও মামলা নিচ্ছেনা পুলিশ। অন্যদিকে ঘটনাস্থল এলাকার পুলিশের বক্তব্যে আত্মহনন চেষ্টার বিষয় উঠে এলেও ধর্ষণের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন। প্রেমের সম্পর্কের জেরে আত্মহননের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক ধারণা পুলিশের।
মিথিলা আক্তার ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের কৃষক হান্নান শেখের মেয়ে। এছাড়া সে স্থানীয় কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল এবং দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সকলের ছোট।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে মিথিলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকে স্তব্দ হয়ে আছে পরিবারের সদস্যরা। মেয়ের এমন মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা হান্নান শেখ এবং অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী মা জেসমিন খাতুনও। পাড়া প্রতিবেশী বাড়িতে ভিড় করছে।
সাংবাদিকদের দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মা জেসমিন খাতুন। তিনি বলেন- “যার সন্তান যহন হারায় যায় তারা কি বইস্যা থাহে? কিন্তু এই পুলিশ-দারোগা, যারা অপরাধী তাঁগের (তাঁদের) শাস্তি দেয় না, খালি ওগো টাহার দরকার! দুই থানায়তে কেস নিলো না ক্যাম্মায়ে (কেমনে)? কেস নেবে না কেন বলেন? আপনি যে অপরাধী, আপনার শাস্তি নাই? যার মৃত্যু অয়ে গ্যাছে- কেস (মামলা) না নিয়ে তাগের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যাম্মায়ে? তাইলে পুলিশ কত লাখ টাহা খাইছে বোঝেন!”
পরিবারটির অভিযোগ, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭ টায় স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মিথিলা। স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পৌঁছালে মোটরসাইকেলে তিন যুবক জোরপূর্বকভাবে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর মাগুরার শ্রীপুর থানাধীন নাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর নির্জন স্থানে নিয়ে তিনজনে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে তাঁদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মধুমতি নদীতে ঝাপ দেয় মিথিলা। তাৎক্ষণিক স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার করে পুলিশকে ফোন দেন এবং ঘটনাস্থলে এসে মিথিলাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরমধ্যে ওইদিন দুপুরে পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে দড়জা লাগিয়ে বিষাক্ত হারপিক পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহযোগিতায় মাগুরা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরেরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকে শারিরীক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা চলছিল তাঁর। এতে কঙ্কালসারে পরিণত হয় শরীর। এরমধ্যে গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে বাড়িতেই মারা যায়। খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরিবারটির অভিযোগ মতে, ধর্ষণকারীদের মধ্যে রয়েছে পাশ্ববর্তী মাগুরা জেলার নাকোল ইউনিয়নের নাকোল গ্রামের হানিফ শেখের ছেলে রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের জিল্লু শেখের ছেলে রাহুল শেখ (২০) ও আশরাফ বিশ্বাসের ছেলে সায়মন বিশ্বাস (২০) নামে তিন যুবক। এতে সহযোগিতা করেন নাকোল গ্রামের মুরাদ শেখের ছেলে সোহাগ শেখ (২০)। এদের মধ্যে রাফি কথিত প্রেমিক ও সোহাগ সম্পর্কে মিথিলার আপন মামাতো ভাই।
মৃত্যুর তিনদিন আগে পরিবারের সদস্যদের ধারণ করা একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারেও ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জড়িত এই চার যুবকের নাম বলেছে মিথিলা।ওই ভিডিওতে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে মিথিলাকে বলতে শোনা যায়- রাফি, রাহুল ও সায়মন আমাকে গণধর্ষণ করেছে। সেখানে আমার মামাতো ভাই সোহাগ সহযোগিতা করেছে। আমি এই চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
মিথিলার ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখ অভিযোগ করে বলেন, আমার শ্যালিকার তিন মাস আগে অন্য জায়গা কাবিন হয়েছিল। এতে ওর মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়, কারন সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাফির সাথে যোগাযোগ করে এই ঘটনা ঘটায়৷
তিনি আরও বলেন, “মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর ঘটনাটি ধর্ষণের বিষয় জানিয়েছিল৷ এরপর ওর নতুন বিয়ে হওয়ায় আমরাও কোথাও জানায়নি। কিন্তু মিথিলা এসব মেনে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চলে গেল। আমরা এই চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
মিথিলার মা জেসমিন খাতুনের ভাষ্যমতে, এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে নেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে তাঁদের শ্রীপুর থানায় পাঠানো হয়। সেখানে মামলা না নিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন- “শ্রীপুর থানায় গেলে ওসি মেলা লিখিত নেয় এবং জোর করে একটা কাগজে সই রাইখ্যা দেয়। আর ওসি বলল- কেস ময়নাতদন্তের পর হবে, এহন অবিনা (হবে না)। তখন থানায় সোহাগ ও রাফির পরিবারের লোকজনও ছিল। পরে মামলা না নিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে কোনো থানায়ই মামলা নিচ্ছে না। আমার মাইয়্যাডাকে এভাবে মাইর্যা ফেলছে, বিচারডা কি কোথাও পাব না।”
এ বিষয়ে জড়িতদের মধ্যে সোহাগের বাবা মুরাদ শেখ বলেন- “ঘটনার দিন আমার ছেলে গাড়ি চালাচ্ছিল৷ তবে ওই তিনজন ওর বন্ধু। ওরাই মেয়েটাকে তুলে এনেছিল- এটা সঠিক। এরপরেই নদীতে ঝাপ দেয় এবং হারপিক খায়। মারা যাওয়ার পর আমিও শুনেছি- ওই তিন ছেলে ধর্ষণ করেছে।”
যা বলছে পুলিশ:
শ্রীপুর থানা পুলিশের তথ্যমতে, রাফি শেখের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মিথিলার। এরমধ্যে মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হয়। এর জের ধরে ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় দুজনে দীর্ঘ সময় গল্প করে এবং নদীতে ঝাপ দেয়। যা দেখতে পায় ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি। নদীতে ঝাপ দেওয়ার পর তাঁর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িকে খবর দেয়ে। পরে এসআই মালেকের নেতৃত্বে মেয়েটিকে উদ্ধার করে ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এক পর্যায়ে দুপুরে বাথরুমে গিয়ে হারপিক খেয়েছিল মিথিলা৷
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন- এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন করেছি। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষনের শিকার হয়েছে- এমন আলামত পাওয়া যায়নি। কারন, ঘাটটির আশপাশে ঝোপঝাড় নেই এবং ফাঁকা। তাছাড়া সেখানে মানুষের যাতায়াত এবং সার্বক্ষণিক মাঝি থাকে। তাঁরা কেউ এ ধরনের দৃশ্য দেখেনি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণ করেছে কি-না সেটা আমার জানা নেই।”
তিনি আরও বলেন- “মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন ধর্ষণের কথা জানায়নি। এমনকি দেড়মাসেও কেউ জানায়নি। তাঁর মৃত্যুর পর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে পরিবার, যা রহস্যজনক। এছাড়া পরিবারের অভিযোগমতে, বাড়ির পাশ থেকে তুলে নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে মধুখালী থানা পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন- “ঘটনাটি জানার পর শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করি এবং থানার ওসি পরিবারকে পাঠিয়ে দিতে বলে। এরপর তাঁরা শ্রীপুরে গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি- মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু দেড়মাস আগের ঘটনাটি আমাদেরকে কেউ জানায়নি। তবে এ বিষয়ে পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
